গ্র্যাজুয়েশন–পরবর্তী জীবন: সুযোগ, নাকি অনিশ্চয়তার শুরু?
· Prothom Alo

রাফসান (ছদ্মনাম) বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করেছে প্রায় এক বছর হলো। ডিগ্রি হাতে পাওয়ার দিন সবাই খুব খুশি ছিল। ছবি তোলা, একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন—তখন মনে হয়েছিল, জীবন যেন এখনই শুরু হতে যাচ্ছে।
Visit h-doctor.club for more information.
কিন্তু এর পর থেকেই তাঁর জীবনে একধরনের শূন্যতা নেমে এসেছে। সকালে আর ক্লাস নেই, পরীক্ষার চাপ নেই, নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই। বন্ধুরা একে একে নিজেদের পথে এগিয়ে যাচ্ছে; কেউ চাকরিতে, কেউ বিদেশে, কেউ নতুন ব্যবসায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাই তাঁদের জীবনের সফলতার গল্প শেয়ার করছে। শুধু রাফসানের মনে হয়, সে যেন কোথাও আটকে গেছে।
আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হলেই একই প্রশ্ন—
‘এখন কী করছ?’
‘চাকরির খবর কী?’
‘এত দিন বসে আছ কেন?’
‘কিছু তো করো!’
এই প্রশ্নগুলো শুনতে সাধারণ মনে হলেও প্রতিবার উত্তর দেওয়ার সময় তাঁর ভেতরে অদৃশ্য একটা চাপ তৈরি হয়। ঠিক বুঝতে পারে না, সে সত্যিই পিছিয়ে পড়ছে, নাকি শুধু নিজের পথ খুঁজছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণী আজ একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরের সময়টা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরে ততটাই জটিল মানসিক অবস্থায় থাকে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই সময়টাকে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের ধাপ বলা হয়। এত দিন একজন মানুষের পরিচয় ছিল ‘শিক্ষার্থী’, হঠাৎ সেই পরিচয় শেষ হয়ে গেলেও নতুন কোনো পরিচয় গড়ে ওঠেনি। এই মাঝামাঝি অবস্থাটিই তৈরি করে গভীর অনিশ্চয়তা।
এ সময় তরুণদের মনে প্রায়ই কিছু নীরব প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—‘আমি আসলে কী চাই?’, ‘কোন কাজ আমাকে মানাবে?’, ‘ভুল সিদ্ধান্ত নিলে কি পুরো জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে?’, ‘অন্যরা এত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, আমি কেন পারছি না?’
ধীরে ধীরে তুলনা শুরু হয়। নিজের জীবনকে অন্যের সাফল্যের সঙ্গে মাপতে মাপতে আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে যেতে থাকে। অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়, পারিবারিক আড্ডা এড়িয়ে চলে। কারণ, তাঁরা জানে, আবারও সেই একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
সমাজ সাধারণত এই সময়টাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে। অনেকেই মনে করেন, যাঁরা ক্যারিয়ার নিয়ে নিশ্চিত নন, তাঁরা অলস, অমনোযোগী বা দায়িত্বজ্ঞানহীন। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সময়টা আসলে নিজের পরিচয় নির্মাণের সময়। মানুষ তখন শুধু চাকরি খোঁজে না, নিজের অর্থপূর্ণ জায়গাটাও খুঁজছে আসলে।
সমস্যা হয় তখনই, যখন ভালোবাসার ভাষাও চাপ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা অজান্তেই বলে ফেলি—‘ওর ছেলে তো চাকরি পেয়ে গেছে…’, ‘তোমার বয়সে আমরা সংসার চালিয়েছি…’, ‘মোবাইল কম ব্যবহার করলে কিছু একটা হতো…’ ইত্যাদি।
এই কথাগুলো হয়তো উদ্বেগ থেকে বলা, কিন্তু শুনতে শুনতে একজন তরুণ নিজের ভেতরেই ব্যর্থতার অনুভূতি তৈরি করে। সে ভাবতে শুরু করে সমস্যাটা হয়তো আমিই। এই সময় অনেকেই আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়। কেউ কেউ বেছে নেয় মাদক। সবার কথা এবং নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে অনেকেই তাড়াহুড়ো করে এমন ক্যারিয়ার বেছে নেয়, যা আসলে তার নিজের নয়; বরং সমাজের প্রত্যাশা পূরণের জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত। পরে সেই সিদ্ধান্তই ক্লান্তি, অস্বস্তি এবং মানসিক বার্নআউটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অথচ ক্যারিয়ার খুঁজে পাওয়া কোনো দৌড় নয়। মানুষের জীবনের সময়রেখা একেকজনের জন্য একেক রকম। কেউ দ্রুত নিজের পথ খুঁজে পায়, কেউ সময় নিয়ে, অভিজ্ঞতা নিয়ে, ভুল থেকে শিখে নিজের জায়গা তৈরি করে। কনফিউশন অনেক সময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং সচেতনতার লক্ষণ। যে মানুষ প্রশ্ন করে, সে আসলে নিজের জীবনের প্রতি দায়িত্বশীল।
কর্মস্থলে নিজেকে উপেক্ষিত মনে হলে কী করবেনএই সময় তরুণদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমালোচনা নয়, নিরাপদ মানসিক পরিবেশ। এমন একটি জায়গা, যেখানে তাঁরা বলতে পারে— ‘আমি এখনো খুঁজছি’ এবং উত্তর হিসেবে পায়, ‘ঠিক আছে, সময় নাও।’
পরিবার, শিক্ষক ও সমাজ যদি বুঝতে পারে যে পথ খুঁজে নেওয়াও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, তাহলে অনেক তরুণ অযথা আত্মদোষে ভুগবে না। পড়াশোনা শেষ হওয়া মানে জীবন প্রস্তুত হয়ে গেছে, এমন নয়; বরং এটি সেই সময়, যখন মানুষ নিজের সত্যিকারের পরিচয়ের দিকে হাঁটা শুরু করে। আজ যারা ক্যারিয়ার নিয়ে কনফিউজড, তারা হারিয়ে যায়নি। তারা দাঁড়িয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে সৎ প্রশ্নের সামনে।
যে মানুষ নিজের পথ খুঁজতে সাহস করে, একদিন সেই মানুষই নিজের পথ তৈরি করে। দরকার শুধু একটু সাহসের, আর সমাজ, পরিবার ও বন্ধুদের পাশে থাকা।
সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ