তলিয়ে যাওয়া হাওরকে বুঝতে হবে হাওরবাসীর আয়নায়

· Prothom Alo

বাংলাদেশে বছরে কতটুকু চাল লাগে? এক হিসাবে চালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ মেট্রিক টন। বোরো মৌসুমেই ‘জাতীয় গোলা’য় ৬০ ভাগ ধান জমা হয়। হাওর থেকে আসে যার ২০ ভাগ। নিজ এলাকার জন্য রেখে শুধু সুনামগঞ্জের হাওরে চাষ করা ধান জাতীয় খাদ্যভান্ডারে জমা করা হয় ছয় লাখ মেট্রিক টন। ফাল্গুন থেকে বৈশাখের নানা মাত্রার বর্ষণে আজ একের পর এক তলিয়ে গেছে হাওরের এই ‘শস্যভাণ্ড’।

দেশের ছয় ভাগের এক ভাগ হলো সাতটি জেলায় বিস্তৃত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চল। এখানে চলতি বোরো মৌসুমে ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়েছে। সব ধান কাটা হয়নি, কাটা ধান শুকানো যাচ্ছে না। খলাতেই (মাড়াই ও শুকানোর জন্য খোলা জায়গা) অংকুরোদ্‌গম হয়ে যাচ্ছে ধান। পচা ধানের গন্ধে বাতাস ভারী হচ্ছে ক্রমে। গত সপ্তাহে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারকে তিন মাস সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে হাওরের সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ শুরু হবে ১৫ মে থেকে।

Visit extonnews.click for more information.

তবে বছরের পর বছর সব সরকারের আমলে হাওর কি এভাবেই তলিয়ে যাবে? ওপর থেকে চাপানো মত, ‘বাইনারি’ তর্ক কিংবা কোনো ঔপনিবেশিকতা দিয়ে হাওরভাটিকে বোঝা যাবে না। হাওরের তলিয়ে যাওয়াকে বুঝতে হবে এর প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক যুগলসন্ধির ঐতিহাসিক জলরেখায়।

আশির দশক থেকেই হাওরের এই ত্রিমুখী সংকটের আলাপ জারি আছে। ‘ভাসান পানির আন্দোলন’সহ হাওরাঞ্চলে সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের জনদাবিকে রাষ্ট্র কোনো দিন আমলে নেয়নি। ‘হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের’ মতো স্থবির প্রতিষ্ঠান নয়, দরকার আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও সর্বজনের অংশগ্রহণে নানা মেয়াদি হাওরমুখী তৎপরতা।
পাভেল পার্থ

১৯৯৮ থেকে যখন হাওরে কাজ শুরু করি, তখন থেকেই হাওরের ত্রিমুখী সংকটগুলো ধারণের চেষ্টা করে চলেছি। সীমানা-দ্বন্দ্ব, অন্যায় ইজারা, দখল–বাণিজ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচিতে ক্ষমতা ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে একধরনের স্থানীয় সংকট আছে। দ্বিতীয় সংকটটি রাষ্ট্রীয় নীতি, আইন ও ব্যবস্থাপনাগত। কৃষি, জলাভূমি, বাস্তুতন্ত্র, প্রাণবৈচিত্র্য, জলাবন, প্রতিবেশবিনাশী উন্নয়ন, করপোরেট বাজার ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ঘিরে রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব এই বিশেষ অঞ্চলকে একটি বহুমুখী বিপদের খাদে দাঁড় করিয়েছে। হাওরের তৃতীয় সংকটটি আন্তরাষ্ট্রিক, উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যে বনভূমি বিনাশ, বহুজাতিক খনন, বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অভিন্ন নদীপ্রবাহের জুলুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। অমীমাংসিত কাঠামোগত বৈষম্য, বৈশ্বিক নয়া উদারবাদ এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের ভেতর এই ত্রিমুখী সংকট প্রতিনিয়ত আরও আগ্রাসী ও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

আশির দশক থেকেই হাওরের এই ত্রিমুখী সংকটের আলাপ জারি আছে। ‘ভাসান পানির আন্দোলন’সহ হাওরাঞ্চলে সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের জনদাবিকে রাষ্ট্র কোনো দিন আমলে নেয়নি। ‘হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের’ মতো স্থবির প্রতিষ্ঠান নয়, দরকার আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও সর্বজনের অংশগ্রহণে নানা মেয়াদি হাওরমুখী তৎপরতা।

হাওরে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে নিয়ে আসছেন এই কৃষক। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ঝাওয়ার হাওরে

‘কাচইরা বছর’ ও হারানো ছৈলাপ

তিন ধরনের ‘বন্যা’ হয় হাওরে। উকিল মুন্সীর গানের মতো ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি’ সাধারণ ঋতুভিত্তিক বন্যা। আরেক রকমের বন্যা হয় উজানের পাহাড়ি ঢলের ‘উব্দা’ বা হঠাৎ নামা পানির তোড়ে। এই হড়কা বন্যার প্রকোপ ও মাত্রা বাড়ছে হাওরে। তৃতীয় বন্যার ধরনটি মূলত হাওরাঞ্চলে অবিরাম অকাল বৃষ্টির ফল। ফাল্গুন থেকে বৈশাখ, বোরো মৌসুমের ধান উগাড়ে (গোলাঘর) তোলার সময় একটানা বৃষ্টি হয়। হাওরে ঘরের চাল চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানিকে বলে ‘টেবলার পানি’। টেবলা-ডুবরার পানিময় টানা বৃষ্টিবাদলের ধরনকে বলে ‘কাচইরা বছর’। এমন বছরে ধান কেবল ‘কাচাইতে’ (কাঁচা) থাকে, পাকতে দেরি হয়। চলতি ১৪৩৩ বাংলা এমনই এক ‘কাচইরা বছর’।

হাওরবাসীর অভিজ্ঞতা বলে, ১০ থেকে ১৫ বছর পরপর ঋতুচক্রে কাচইরা বছর ফিরে আসে। বান্দরবানের ম্রোরা যেমন ‘ইঁদুর বন্যা’কে (ব্যাম্বো ফেমিন) ঋতুচক্রের এক ধারাবাহিক পরিবর্তন হিসেবে দেখেন। ১৯৭৪ সালও ছিল এক বিনাশী কাচইরা বছর। চলতি ১৪৩৩ বাংলার কাচইরা বছরে বন্যায় ধান তলিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটি হাওরে অচেনা। এমন ‘জলাবদ্ধ বন্যা’র ধরন হাওরে নতুন, ২০১৭ সাল থেকে এর বিস্তার ও মাত্রা বাড়ছে।

খনার বচন, পই, প্রবাদ, ডাক-ডিঠান ছিল হাওরবাসীর কাছে দুর্যোগ–পূর্বাভাসের পঞ্জিকা। গ্রামীণ প্রবাদকে হাওরে বলে ‘ছৈলাপ’। সুনামগঞ্জের সজনার হাওরে শোনা এক প্রাচীন ছৈলাপ জানায়, ‘পুবের ধনু নিত্যি বর্ষে, পশ্চিমের ধনু সাগর শুষে,/ উত্তরের ধনু বায় বাণ,/ দক্ষিণের ধনু খায় ধান।’ অনেকের সঙ্গে কথা হলো, এবার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকেই অনেক হাওরে বৃষ্টির দমক এসেছে। হাওর বাঁচাতে প্রাতিষ্ঠানিক পূর্বাভাসের সঙ্গে লোকায়ত জ্ঞানের সমন্বয় জরুরি।

আশির দশক থেকেই হাওরের এই ত্রিমুখী সংকটের আলাপ জারি আছে। ‘ভাসান পানির আন্দোলন’সহ হাওরাঞ্চলে সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের জনদাবিকে রাষ্ট্র কোনো দিন আমলে নেয়নি। ‘হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের’ মতো স্থবির প্রতিষ্ঠান নয়, দরকার আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও সর্বজনের অংশগ্রহণে নানা মেয়াদি হাওরমুখী তৎপরতা।

অন্যায় ‘বাঁধ-বাণিজ্য’ ও শাহ আবদুল করিমের গান

পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল উত্তর-পূর্ব ভারতের চেরাপুঞ্জির ভাটিতে বাংলাদেশের হাওরগুলো। এমনকি দেশের সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল শ্রীমঙ্গলও হাওরাঞ্চলেই। ১৯২০ সালে প্রকাশিত শ্রী অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ) জানায়, সুনামগঞ্জে বৃষ্টির পরিমাণ অধিক এবং ১৯০৪ সালে প্রায় ২১০ ইঞ্চি বৃষ্টি হয়েছিল। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত ‘আসাম জেলা গেজেটিয়ার’–এ সুনামগঞ্জে বছরে ২১০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাতের কথা উল্লেখ আছে।

পাউবোর (২০২৫) জরিপমতে দেশে ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদীর ভেতর সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বাধিক ৯৭টি নদী আছে; আছে বিল ও জলাভূমি। বৃষ্টির দেশে বৃষ্টি হবে, পানি গড়িয়ে বিল ও নদী হয়ে সাগরে পৌঁছে যাবে; কিন্তু পানির এত প্রাকৃতিক আধার থাকার পরেও হাওরাঞ্চলে ‘জলাবদ্ধ-বন্যা’ বাড়ছে কেন?

২০২২ সালের জুন মাসের বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের ৯০ ভাগ এবং সিলেটের প্রায় ৮০ ভাগ এলাকা তলিয়ে যায়। ওই বছরের ১৭ জুন সিলেটে ২৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ২০০০ সালের ১২ জুন ৩৬২ মিলিমিটার এবং ১৯৫৯ সালের ১৯ জুন ৩৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড আছে। ২০২৪ সালের ৯ জুন সিলেটে কয়েক ঘণ্টায় ২২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে অকাল বর্ষণে সব হাওর তলিয়ে গিয়েছিল। চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল সুনামগঞ্জের লাউড়ের গড়ে ১৩৩, দিরাইতে ২০৫, ছাতকে ৭৬ ও সদরে ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

পাউবোর (২০২৫) জরিপমতে দেশে ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদীর ভেতর সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বাধিক ৯৭টি নদী আছে; আছে বিল ও জলাভূমি। বৃষ্টির দেশে বৃষ্টি হবে, পানি গড়িয়ে বিল ও নদী হয়ে সাগরে পৌঁছে যাবে; কিন্তু পানির এত প্রাকৃতিক আধার থাকার পরেও হাওরাঞ্চলে ‘জলাবদ্ধ-বন্যা’ বাড়ছে কেন?

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দলিল নয়; জলাবদ্ধ-বন্যার উত্তর আমরা হাওরের গান আর জনবিবরণীতেই খুঁজে পাব। তবে হাসন রাজা (১৮৫৪-১৯২২), রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ (১৮৩৩-১৯১৫), শিতালং শাহ (১৮০৬-১৮৯৯), দুর্বিন শাহ (১৯২০-১৯৭৭) কিংবা উকিল মুন্সীর (১৮৮৫-১৯৭৮) গানে হাওরের ‘জলাবদ্ধ–বন্যা কিংবা তলিয়ে যাওয়ার’ নথি দেখা যায় না; বরং তাঁদের গানে হাওর বিবৃত হয়েছে এক প্রাণদায়ী জীবনের রূপকল্প হিসেবে।

তবে শাহ আবদুল করিমের (১৯১৬-২০০৯) গানে হাওরের বন্যার পরিবর্তন, সংকট ও কারণগুলো পাওয়া যায়। অন্যদের গানে সময়ে হাওরে এই জলাবদ্ধ-বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের প্রকোপ শুরু হয়নি। শাহ আবদুল করিম এই বন্যাকে ‘ভেজাইল্যা বন্যা’ বলেছেন। ১৯৭৪ সালে হাওরের বন্যা নিয়ে তাঁর একটি গান আছে। হাওরের বন্যা ও ফসলহানির কারণ হিসেবে শাহ আবদুল করিম তাঁর আরেক গানে জানান, ‘চৈত্র মাসে বৃষ্টির জলে নিল বোরো ধান,/ ভেবে মরি হায় কী করি, বাঁচে কি না প্রাণ/ এই দেশেতে ফসল রক্ষা বড়ই বিভ্রাট।/ দেশের যত নদ–নালা হয়েছে ভরাট/ বৃষ্টি হইলে কূল ডুবাইয়া নদীর পানি হাওরে চলে,/ ফসল নিল সমূলে’।

করিমের গানের এই বার্তা হাওর–সংশ্লিষ্ট দপ্তর, বিশেষজ্ঞ, আমলা ও উন্নয়নবিদেরা আমলে নেননি। হাওরে জলাবদ্ধ-বন্যার কারণ মূলত নদী, বিল ও জলাভূমি ভরাট। হাওরের কান্দা থেকে ধাপে ধাপে বিল পর্যন্ত ভূমির যে শ্রেণি, তা উন্নয়নের নামে পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতাকাঠামো আর হাওরবিমুখ প্রকৌশলীরা হাওরের জলপ্রণালি ও বাস্তুতন্ত্রকে চুরমার করে অপরিকল্পিত রাস্তা, অবকাঠামো আর বাঁধ নির্মাণ করেছেন। এসব প্রকল্প হাওরে দুর্নীতি–বাণিজ্য, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সংঘাতের নতুন গল্প তৈরি করেছে। হাওরের ‘জাংগাল’ (উঁচু জায়গা) আর জমিনের মাটি কেটে ফসল রক্ষা বাঁধগুলো বানানো হয়। ঢলের পানিতে বাঁধ ভেঙে মাটি জমা হয় নদী ও বিলের তলায়। একই সঙ্গে উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা পাহাড়ি বালুতেও ভরাট হচ্ছে হাওর।

পাউবোর হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৬—এই তিন অর্থবছরে কেবল সুনামগঞ্জ জেলায় ২ হাজার ১৩৬টি ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে ৯৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৮ ঘনমিটার মাটি। এই পরিমাণ মাটি দিয়ে ৩ হাজারের বেশি পুকুর ভরাট করে ফেলা সম্ভব। টাঙ্গুয়ার মতো আয়তনের কোনো হাওরের প্রায় ৪ ইঞ্চি পুরু কিংবা কোনো নদীর ১০ কিলোমিটার এলাকা ভরাট করে দিতে পারে ওই মাটি। হাওর, বিল ও নদীগুলো কতটুকু ভরাট হয়েছে, তার জাতীয় সমীক্ষা হওয়া দরকার। নদী ও বিল খনন করে প্রাকৃতিক পানির গভীর আধারগুলো মুক্ত করা দরকার। করিমের গানেও সবাইকে কোদাল হাতে খননের আহ্বান আছে। সরকারের খাল খনন কর্মসূচিকে হাওরের বাস্তবতায় নদী ও বিল খনন কর্মসূচিতে রূপান্তর করা জরুরি।

গভীর পানির ধানের শক্তি

নেত্রকোনার মদনেরতলা ও পুলাহাটি হাওরের ভূঁইয়াহাটি গ্রামের কামরুল ইসলাম, বাওইর হাওরের বারঘরিয়া গ্রামের নাছরীন আক্তার, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের দাসনোয়াগাঁও গ্রামের সারদা চরণ দাস, রূপসা হাওরের রাখাল দাস, শাল্লার ছায়ার হাওরের ঘুঙ্গিয়ারগাঁওয়ের মো. একরামুল হোসেন এবং মধ্যনগরের টাঙ্গুয়ার হাওরের বংশীকুন্ডা বাসাউড়া গ্রামের করুণাসিন্ধু সরকারের সঙ্গে আলাপ হয়েছে মুঠোফোনে। কৃষকেরা বলেন, প্রত্যেকেই বহু ঋণ-কর্জ করে গিরস্তি করেন। ১ কেয়ার জমি চাষে ৮ হাজার টাকা বর্গা এবং ৭ হাজার টাকা চাষের খরচ মিলিয়ে মোট ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। ১ কেয়ারে ২০ থেকে ২৫ মণ ধান হয়। সরকারি দামে প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা করে বিক্রি করলে কৃষকের হাতে কিছুই থাকে না। চাষের খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করে হাওরাঞ্চলে ধান-চাল ক্রয়ের নতুন দাম নির্ধারণ করা জরুরি। কৃষকেরা জানান, প্রায় সবাই এখন ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-১০০, ব্রি-৯২, ব্রি-৫৮, হীরা, জনকরাজ ধানই চাষ করেন; কিন্তু দেশি ধানের মতো এসব জাত অল্প বৃষ্টি-পানির ধাক্কাও সহ্য করতে পারে না।

১৯৩৪ সালে হাওরে, হবিগঞ্জের নাগুড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান’। গচি, রাতা, টেপী, বইয়াখাওরী, গদালাকি, সমুদ্রফেনা, সকালমুখী, হাতিবান্ধা, চুরাক, লাখাইয়ের মতো গভীর পানির ধানের জন্ম হাওরে। রাষ্ট্র হাওরের সেই শক্তি ও মর্যাদাকে ধরে রাখেনি। ‘সবুজ বিপ্লব প্রকল্প’ হাওরেও চাপিয়ে বিষনির্ভর উফশী ও হাইব্রিড বীজের সাম্রাজ্য। স্থানীয় জাতের ভেতর আগাম, বন্যা–সহিষ্ণু ও শিলাবৃষ্টি–সহিষ্ণু জাত আছে। হাওরের শক্তিময় জাতগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও চাষের ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া দরকার। দানার ফলন কম হলেও ঝুঁকি কমিয়ে এসব জাত নিরাপদ, সহিষ্ণু ও সার্বভৌম ভবিষ্যৎ রচনা করবে।

নয়নভাগার কষ্ট ও ‘জাতীয় ধানকাটা বর্ষপঞ্জি’

‘নয়নভাগা’ নামে এক নিদারুণ ভাগপ্রথা আছে হাওরে। চোখের সামনে বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ধান বাঁচাতে অনেক শ্রমিক নয়নভাগাতে ধান কাটেন। কাটা ধানের এক ভাগ কৃষক পান আর কৃষিশ্রমিক পান এক ভাগ। হাওরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে শ্রমিকের সংকট। চলতি মৌসুমে নয়নভাগাতে কাটার জন্যও শ্রমিক মিলছে না। হার্ভেস্টার মেশিনগুলো পানি বা কাদাজমিতে নামতে পারে না। উঁচু চাকার হার্ভেস্টার ও ধান শুকানোর যন্ত্রের দাবি তুলেছেন অনেকে।

হাওরসহ দেশের সব অঞ্চলের ধান কাটার সময় বিবেচনা করে একটি ‘জাতীয় ধানকাটা বর্ষপঞ্জি’ প্রস্তুত করা দরকার। দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এর কার্যকর প্রচারণা সম্ভব। ধানকাটাসহ কৃষিকাজকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে তরুণ উদ্যোক্তরাও নিতে পারেন।

হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতা চিত্ত রঞ্জন তালুকদারের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ১৯৬০ সালে হাওরের এক বন্যার স্মৃতিচারণা করে বলেন, বাংলা ফাল্গুন মাসে অবিরাম বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের তোড় সেবার নেমেছিল নদী ও হাওরে। বিল ও নদীগুলো গভীর থাকায় কোনো ফসলের জমি তলায়নি। মানুষও ঢাল হয়ে রক্ষা করেছিল ফসল। জমি ও জলা রক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়াবার বহু নজির আছে হাওরে। তলিয়ে যাওয়া হাওরকে বুঝতে হলে রাষ্ট্রকে এর মর্ম ধারণ করতে হবে।

Read full story at source