‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’
· Prothom Alo
বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। এ সময় সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে ঘর। তবে সে ঘর যেন খোলা না থাকে, দরজা-জানালা বন্ধ ঘরে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে, খোলা জায়গায় কিংবা হাওরে অবস্থান করা যাবে না। এসব বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে সিলেটে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় শহরতলির বিমানবন্দর এলাকায় গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ‘বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস: কমিউনিটিভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা’ শিরোনামে এ বৈঠক হয়। বেলা দুইটা পর্যন্ত বৈঠক চলে।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা আরও বলেন, বজ্রপাত বা বজ্রঝড় বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর এক দিন আগে, কখনো বজ্রপাতের তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে পূর্বাভাস বা সতর্কবার্তা দিয়ে থাকে। সেটি স্থানীয় পর্যায়ে বেশি করে ছড়িয়ে দিতে হবে। এটা করা হলে প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব।
বৈঠকে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলে প্রতিবছর, বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে। বজ্রপাতের বার্তা যদি দুই ঘণ্টা আগেও জানা যায়, তাহলে সেই এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ জন্য আমাদের একেবারে গ্রাম পর্যায়ে সভা–সেমিনার করতে হবে। ১০ মের পর সিলেটে সচেতনতামূলক একাধিক কর্মসূচি নেওয়া হবে।’
মো. সারওয়ার আলম, জেলা প্রশাসক, সিলেট সিলেট অঞ্চলে প্রতিবছর, বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে। বজ্রপাতের বার্তা যদি দুই ঘণ্টা আগেও জানা যায়, তাহলে সেই এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর বর্তমানে পাঁচ দিনের পূর্বাভাস প্রদান করে, যার নির্ভুলতার হার প্রায় ৯০ শতাংশ। ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বজ্রপাতের ঘটনার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর দুটি আধুনিক ডপলার রাডার ব্যবহার করে মেঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। যখনই বজ্রপাতের মেঘ তৈরি হয়, ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ঘটনার দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে তাৎক্ষণিক সতর্কতা জারি করে।
মমিনুল ইসলাম আরও বলেন, দেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ মারা যায়। তবে এ বছর এই মৃত্যুর হার আরও বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মানুষ সাধারণত ঘূর্ণিঝড় নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে, কিন্তু বর্তমানে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। আগাম সতর্কবার্তাকে কার্যকর করতে হলে তা অবশ্যই তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশে ২০২০ সালে ৪২৭ জন এবং সম্প্রতি মাত্র চার থেকে পাঁচ দিনে ৭১ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। বিপরীতে ভেনেজুয়েলায় বছরে প্রায় ৩০০ দিন বজ্রপাত হলেও সেখানে বছরে গড়ে মাত্র ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এর মূল কারণ হলো তারা সচেতনতাকে একটি ইতিবাচক সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে পেরেছে। আমাদের এখানকার মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে গাছের কাছে কিংবা অ্যারেস্টার থাকলে সেখানে যাওয়া নিরাপদ, যা আসলে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’
নিতাই চন্দ্র দে সরকার আরও বলেন, হাওর অঞ্চলের জন্য মানুষ এবং গবাদিপশু—উভয়ের সুরক্ষায় ডুয়েল ফ্যাসিলিটি-সম্পন্ন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ওপরে লাইটিনিং অ্যারেস্টার বসানোর নকশা করা হয়েছিল, যাতে খোলা জায়গায় থাকা মানুষ নিরাপদ আশ্রয় পায়। তবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটি এখনো অনুমোদিত হয়নি।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল হাওর অঞ্চলে শুধু এক বছরের জন্য নয়, বরং ১৮ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করছে। এতে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোর এবং ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যুবকদের নিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ বজ্রপাত, বন্যা, খরা নিয়ে কাজ করা হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে ইয়ুথ ক্লাব এবং স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্বুদ্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে জাতীয় যুবনীতি অনুসারে তরুণদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হবে। এ ছাড়া মে এবং জুন মাসে হাওর অঞ্চলের শতভাগ মানুষের কাছে বজ্রপাতের সতর্কতা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কবিতা বোস তাঁর বক্তব্যে নরওয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে বজ্রপাত থেকে বাঁচতে বিশেষ ধরনের ‘বজ্রকোট’ বা রেইনকোটের মতো পোশাক তৈরি করা যায় কি না, সে পরিকল্পনার কথাও বলেন। এ ছাড়া কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ঘর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা
গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতেই আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। এতে তিনি বলেন, ‘শুনলে বজ্রধ্বনি ঘরে যাই তখনই। এটি একমাত্র বাঁচার উপায় হতে পারে। যখনই বজ্রধ্বনি শোনা যাবে, তখনই দৌড়ে ঘরে যেতে হবে। কারণ, ঘর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।’
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফাতেমা আক্তার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি বলেন, বজ্রপাতের সময় কী করণীয়, কী করা যাবে না, মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট তথ্য দেওয়া প্রয়োজন; যাতে প্রাণহানি কমিয়ে আনা যায়।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গবাদিপশু কৃষকেরা হাওরে নিয়ে যায়, হাঁসের খামারিরা হাওরে চরানোর জন্য নিয়ে যায়। তখন বিপত্তিটা বাধে, বজ্রঝড় শুরু হলে হাওরে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র থাকে না। মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশু আক্রান্ত হয়। সামনে কোরবানির ঈদ। আর এই সময়ই বজ্রপাতের মৌসুম। এ সময়ে কোনো খামারি কিংবা কৃষকের গবাদিপশু মারা গেলে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আবদুল ওয়াহিদ বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের খবর বা বজ্রপাতের আগাম আভাস সাধারণত মোবাইলের মাধ্যমে অথবা একে অপরের মুখে শুনে জানতে পারেন। হাওর এলাকায় অনেক সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না। ফলে উপস্থিত সময়ে খবর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। হাওরে কাজ করতে যাওয়া মানুষ বাড়ি থেকে তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে থাকে। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে বাড়িতে ফিরতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগে, যার ফলে পথেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে।
সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আবদুল কুদ্দুস বুলবুল বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বজ্রপাত কিংবা বজ্রঝড়ের তথ্য পাওয়া গেলে ২০ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার করা সম্ভব। এতে হতাহতের পরিমাণ কমে আসবে।
স্বেচ্ছাসেবী রেছনা বেগম বলেন, মানুষ সাধারণত স্পষ্ট নির্দেশনামূলক বার্তাগুলো বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং মানে। যেমন নিরাপদ আশ্রয়ে যান, খোলা মাঠে থাকবেন না বা জলাশয় থেকে উঠে আসুন। এলাকার মানুষ মসজিদের মাইকের ঘোষণা এবং স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তি বা নেতাদের দেওয়া তথ্য বেশি বিশ্বাস করে। তাই বজ্রপাতের ঝুঁকি এড়াতে সচেতনতা তৈরিতে এসব বিষয়কেও প্রাধান্য দিতে হবে।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ডিরেক্টর নিশাত সুলতানা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইরার প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মো. কামরুজ্জামান, ইরার লাইট প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী শেখ কামরুল হোসেন, উন্নয়ন সংস্থা নিরাপদের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রাশেদুল হাসান, প্রথম আলোর সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ এবং উপকারভোগী জহুর উদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।