‘আরেক কোরবানির ঈদ আইল, গরুর মাংস আর রানবার ভাগ্য আমরার হয় নাই’
· Prothom Alo
টিনের চালা ও বেড়ায় অসংখ্য ছিদ্র। সকালে ভারী বৃষ্টির ফোঁটা সেসব ছিদ্র দিয়ে ঘরে ঢোকে। দুপুরে বৃষ্টি কমে এলেও ঘরের মেঝেতে থিকথিকে ভাব। হালকা-ভেজা বিছানায় খেলতে খেলতে গড়াগড়ি খাচ্ছে দুই শিশু। পাশে বসেই মা নাছিমা শোনাচ্ছিলেন তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প, জীবনের কষ্টগাথা।
পেশায় গৃহপরিচারিকা নাছিমা থাকেন সিলেট নগরের পনিটুলা এলাকায় ভাড়া বাসায়। বুধবার বিকেলে সেই বাসায় বসে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। চাহনিতে একরাশ শূন্যতা আর করুণ মুখে নাছিমা বললেন, ‘মানুষের বাসায় বাসায় গিয়া কাজকাম করি। আয়-রুজি কম। স্বামী থাইকাও নাই, আরেক সংসার নিয়া সে আছে। চারই সন্তান নিয়া আর পারতাছি না সংসার চালাইতে। টাইনা-ছেঁচড়াইয়া (হিঁচড়ে) দিন যাইতাছে।’
Visit umafrika.club for more information.
নাছিমার দুই মেয়ে, দুই ছেলে। বড় মেয়ে সুরাইয়া আক্তারের বয়স ১৮ বছর। দুই ছেলে রাহিম হাসান (১১) প্রথম শ্রেণিতে ও আলী হোসেন (৬) শিশু শ্রেণিতে স্থানীয় আখালিয়া এলাকার ফুরকানিয়া ক্বাওমীয়া মাদ্রাসায় পড়ছে। ছোট মেয়ে সুমাইয়া আক্তার আলিয়ার বয়স ৪। স্বামী কোনো ভরণপোষণ দেন না। নাছিমাকেই সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সামলাতে হয়।
বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করে মাসে আট–নয় হাজার টাকা আয় করেন নাছিমা। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিলসহ এক কক্ষের ঘর ভাড়া বাবদ দিতে হয় তিন হাজার টাকা। খাওয়া বাবদ খরচ পড়ে পাঁচ–ছয় হাজার টাকা। থাকা-খাওয়াতেই আয়ের পুরো টাকাই ব্যয় হয়। অভাবের সংসারে টানাটানি আর শেষ হয় না। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে দিন দিন তাঁর জীবনে কেবল কঠিন সময়ই আসছে।
চোখ হারিয়েও হার মানেননি, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গোলাম মোস্তফার বেঁচে থাকার গল্পআক্ষেপের ঝড় নাছিমার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘এক বেলা রান্ধি, তিন বেলা খাই। টাকার অভাবে রান্ধাও বন্ধ থাকে অনেক সময়। মাছ খাই না, মাসের পর মাস যায়। আলুই ভরসা। আলুভাজি, আলুভর্তা দিয়াই সব সময় ভাত খাইতে হয়। বাচ্চারা মাছ খাওয়ার বায়না ধরেছিল, সর্বশেষ ১৫-২০ দিন আগে মিরকা (মৃগেল) মাছ রানছিলাম। শেষ মাংস রানছিলাম রোজার ঈদে, পোলট্রি মুরগি। গত কোরবানির ঈদে চাইয়া-মাইগা গরুর মাংস আনছিলাম। আরেক কোরবানির ঈদ আইল; কিন্তু গরুর মাংস আর রানবার ভাগ্য আমরার হয় নাই।’
আলাপে আলাপে নাছিমা তাঁর অভাবের কথা বলেন। তিনি জানান, ঈদের সময় বাসাবাড়ির মালিকেরা বেতনের সঙ্গে বাড়তি যে বোনাস দেন, তা দিয়ে সন্তানদের নতুন কাপড় কেনার চেষ্টা করেন। অনেক বাসাবাড়ির মালিক পুরোনো কাপড় দেন, তা দিয়ে নিজের চাহিদা মেটান। আয় কম হওয়ায় অনেক সময় তাঁকে ঋণ করতে হয়। কয়েক মাস আগে মাসে এক হাজার টাকা সুদে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা ধার এনেছেন। এ ছাড়া দোকানে বকেয়া পড়েছে সাত হাজার টাকা।
নাছিমা জানান, চলতি মাসে দুই ছেলেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় মাদ্রাসায় ভর্তি করেছেন। মাদ্রাসায় প্রতি মাসে তাদের বেতন দিতে হবে ৪০০ টাকা। খাতা-কলম বাবদ আরও ৪০০ টাকা দিতে হয়। দুই ছেলের জন্য মাদ্রাসার পোশাক তৈরি করতে ২ হাজার ২০০ টাকা খরচ পড়বে। হাতে টাকা না থাকায় ছেলেদের পোশাক তৈরি করে দিতে পারছেন না। এ ছাড়া তাদের শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র তৈরি করতে ১৬০ টাকা লাগবে।
আগামী রোববার ৩৮ বছর পূর্ণ হবে নাসিমার। রোগেশোকে ভুগে প্রথমে বাবা, পরে মা মারা যান; তখন নাছিমার বয়স মাত্র এক বছর। তিন বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে নাছিমা ছিলেন ছোট। সুখের আশায় সাত বছর বয়সে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের শ্যামারচর গ্রামের বাড়ি ছেড়ে বড় বোনের সঙ্গে সিলেট শহরে আসেন। ‘সেই যে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু, এখনো তা চলছে’, বললেন নাছিমা।
শৈশবে সিলেটে আসার পর এ–বাসায় ও–বাসায় কাজ করে কোনোরকমে চলতেন নাছিমারা। তিনি জানান, ১৯ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার কাজলা গ্রামের রঞ্জু মিয়ার সঙ্গে। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর স্বামী আগে আরেকটা বিয়ে করেছেন। রাগে-দুঃখে ফের চলে আসেন সিলেটে। এখন মাঝেমধ্যে স্বামীর বাড়িতে যান, স্বামীও মাঝেমধ্যে সিলেটে আসেন। সম্পর্ক অনেকটা ‘সুতার মতো দুলছে।’
দিনরাত খাটি, তবু সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিনাছিমা বলেন, ‘কষ্ট করে বড় হইছি। এখনো কষ্ট করতাছি। হাতে বেদনা, পায়ে বেদনা, ঘাড়ে বেদনা। শরীরে অসুখের শেষ নাই। তাপও উঠছে। তাই আইজ (গতকাল বুধবার) বড় মাইয়ারে পাঠাইছি আমার কাজের বদলি হিসেবে। আমি আর আইজ কাজে যাই নাই। টাকার অভাবে ওষুধও খাইতা পারতাছি না। কয়েক দিন আগে কিছু কাজ ছুইটা (চলে) গেছে। নতুন করে কাজ আর পাই নাই। কীভাবে দিন চলব, চোখে আন্ধাইর দেখতাছি।’
কথা বলতে গিয়ে নাছিমার কণ্ঠ ধরে আসে। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত (বুধবার বেলা ৩টা) বাচ্চারা কিছু খায়নি। এলাকার একজনের আলু ও পেঁয়াজ কিনে দিয়েছি। তিনি ২০ টাকা বকশিশ দিলেন। এ টাকা দিয়ে দুটো ডিম কিনেছি। ডিমের বিরান করব, ভাত রানছি। তাই দিয়া বাইচ্চারা খাইব। টানাটুনির সংসার, প্রতিদিন সংগ্রাম কইরা চলা লাগতাছে। শৈশবের অভাব মাইঝ (মধ্য) জীবনে আইসাও দূর হয়নি।’
‘দুপুরে শুকনো কিছু খেয়ে কাজ চালাই, যদি একটু টাকা বাঁচে’