নীরবে কোটি গ্রাহকের ফোনে নেক্সাস পে

· Prothom Alo

বাংলাদেশে ক্যাশলেস লেনদেন বা নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনার উদ্যোগে শক্তিশালী এক অবস্থান তৈরি করেছে বেসরকারি ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ‘নেক্সাস পে’। নীরবে ব্যাংকটির এই অ্যাপ সেবা পৌঁছে গেছে প্রায় এক কোটি গ্রাহকের কাছে। ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক ও ব্যাংকটির মোবাইল ব্যাংকিং সেবা রকেটের গ্রাহকের পাশাপাশি অন্য ব্যাংকের গ্রাহকেরাও এখন এই সেবা ব্যবহার করছেন। ফলে নেক্সাস পে অ্যাপটি ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় সর্বজনীন এক অ্যাপ হয়ে উঠেছে।

Visit turconews.click for more information.

নেক্সাস পে–সংক্রান্ত ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত বছর অ্যাপটির মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্রাহক ও লেনদেন। এই অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ ও ১৬ শতাংশ নারী। গ্রাহকেরা মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার থেকে এই অ্যাপ ব্যবহার করে যেকোনো সময় লেনদেন সেবা নিতে পারছেন।

এ বিষয়ে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এহতেশামুল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুতে নেক্সাস পে অ্যাপ অল্প কিছু ফিচার নিয়ে যাত্রা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে অ্যাপটিতে আরও অনেক নতুন ফিচার যুক্ত করা হয়। ফলে মাসে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। আমাদের স্বপ্ন নেক্সাস পে হয়ে উঠবে সব ধরনের লেনদেনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে গ্রাহকেরা শাখায় না গিয়েই তাঁদের অধিকাংশ লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন স্বাচ্ছন্দ্যে। আমরা সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই অগ্রসর হচ্ছি।’

আট বছরেই কোটি গ্রাহক

ব্যাংক–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক নেক্সাস পে সেবা চালু করে। অবশ্য অ্যাপ চালুর আগে থেকে ব্যাংকটি ডিজিটাল সেবায় ছিল পথপ্রদর্শক। এটিএম বুথকে গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া ও প্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা রকেট চালু করে ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক তার প্রমাণ রেখেছে। ২০১৮ সালে নেক্সাস পে চালুর পর ধীরে ধীরে সেবার পরিধি ও আওতা বাড়াতে থাকে ব্যাংকটি। যুক্ত করে নানা সুবিধা। ফলে গ্রাহকও বাড়তে থাকে। এখন ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের গ্রাহকের পাশাপাশি যেকোনো ব্যাংকের ভিসা ও মাস্টারকার্ড দিয়েও নেক্সাস পে সেবাটি ব্যবহার করা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে নেক্সাস পে অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৬২ লাখ ৮১ হাজার। এর মধ্যে ৫৭ লাখ ২৩ হাজার ছিল ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের গ্রাহক। ৪ লাখ ৫৯ হাজার ছিল রকেটের গ্রাহক। অন্য ব্যাংকের গ্রাহক ছিল ৯৯ হাজার। ২০২৫ সালে মোট গ্রাহক বেড়ে হয়েছে ৯০ লাখ ৪৩ হাজার। এর মধ্যে ৮০ লাখ ৮৪ হাজার ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের গ্রাহক। রকেটের গ্রাহক ৮ লাখ ১৭ হাজার ও অন্য ব্যাংকের ১ লাখ ৪১ হাজার। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে গ্রাহক বেড়েছে ৪ লাখ ৭ হাজার। ফলে গত মার্চ শেষে গ্রাহক বেড়ে হয়েছে ৯৪ লাখ ৫০ হাজার।

এহতেশামুল হক খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকএহতেশামুল হক খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকআমাদের স্বপ্ন নেক্সাস পে হয়ে উঠবে সব ধরনের লেনদেনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে গ্রাহকেরা শাখায় না গিয়েই তাঁদের অধিকাংশ লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন।

লেনদেনেও রেকর্ড

নেক্সাস পের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকিং অ্যাপে এর আগে এত গ্রাহক ও লেনদেন হয়নি। ২০২৩ সালে এই প্ল্যাটফর্মে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে লেনদেন আরও বেড়ে হয় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় চার গুণ বেড়েছে অ্যাপটিতে। এদিকে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) অ্যাপটির মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৬২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, নেক্সাস পের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্থ আদান-প্রদান হচ্ছে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তরে। ২০২৫ সালে এই খাতে লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে অন্যান্য ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে ৮৬ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। কেনাকাটা এবং বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও নেক্সাস পে এখন পছন্দের তালিকায় উঠছে। ২০২৫ সালে ৪ হাজার ১৯১ কোটি টাকার পরিসেবা বিল পরিশোধ করা হয়েছে এই অ্যাপের মাধ্যমে। এ ছাড়া কিউআর কোড ব্যবহার করে কেনাকাটা হয়েছে ৮১৬ কোটি টাকার। মোবাইল রিচার্জ বা টপ-আপের ক্ষেত্রেও অ্যাপটির ব্যবহার বাড়ছে। যার পরিমাণ ২০২৫ সালে ছিল ১৯১ কোটি টাকা।

কেবল অর্থের পরিমাণেই নয়, লেনদেনের সংখ্যার দিক থেকেও নেক্সাস পে রেকর্ড গড়েছে। কারণ, দেশজুড়ে এক লাখ ৮০ হাজার দোকানে কিউআর কোড দিয়ে নেক্সাস পে–তে লেনদেন সুবিধা রয়েছে। ২০২৩ সালে মোট ৪ কোটি বার অ্যাপটি ব্যবহার করে লেনদেন করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে লেনদেন সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি বারে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই অ্যাপটিতে ২ কোটি ২৬ লাখ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।

কীভাবে ব্যবহার করবেন নেক্সাস পে

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এই সুবিধা নিতে গ্রাহককে প্রথমে গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে অফিশিয়াল ‘নেক্সাস পে’ অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। অ্যাপটি ওপেন করে নিবন্ধন বাটনে ক্লিক করার পর ব্যবহারকারীকে তার সচল মোবাইল নম্বর ও সিম অপারেটর নির্বাচন করতে হবে। এরপর মোবাইলে আসা ওটিপি বা একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড দিয়ে নম্বরটি যাচাই করে নিতে হবে। সবশেষে নাম, ই–মেইল ঠিকানা এবং নিজের পছন্দমতো ৬ ডিজিটের একটি গোপন পিন সেট করার মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে প্রাথমিক নিবন্ধনপ্রক্রিয়া।

সফলভাবে লগইন করার পর ব্যবহারকারীকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত কার্ড বা অ্যাকাউন্টটি অ্যাপে যুক্ত করে নিতে হয়। এ জন্য ড্যাশবোর্ডের ‘অ্যাড কার্ড’ অপশনে গিয়ে কার্ডের ধরন (যেমন নেক্সাস ডেবিট, রকেট, ভিসা বা মাস্টারকার্ড) নির্বাচন করতে হবে। এরপর কার্ডে থাকা নাম, কার্ডের ১৬ ডিজিটের নম্বর এবং পিন নম্বর প্রদান করার পর পুনরায় ওটিপি দিয়ে যাচাই করলেই কার্ডটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপে সক্রিয় হয়ে যাবে। এর ফলে গ্রাহক ড্যাশবোর্ড থেকেই সরাসরি ব্যালান্স বা অ্যাকাউন্টের সর্বশেষ স্থিতি দেখার সুযোগ পাবেন।

প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের বাইরেও নেক্সাস পে অ্যাপে রয়েছে ভার্চ্যুয়াল ‘লয়্যালটি পয়েন্টস কার্ড’ তৈরির সুবিধা, যা ব্যবহার করে বিভিন্ন কেনাকাটায় অফার ও ক্যাশব্যাক উপভোগ করা যায়। এ ছাড়া এই অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল রিচার্জ ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা সহজতর হয়েছে। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের গ্রাহকেরা এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অন্য যেকোনো ব্যাংক হিসাবে তহবিল স্থানান্তর করতে পারলেও, অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারকারীদের জন্য বর্তমানে এই নির্দিষ্ট সুবিধাটি সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। তবে কেনাকাটা বা বিল পরিশোধের মতো অন্যান্য ডিজিটাল সেবাগুলো সবার জন্যই উন্মুক্ত।

Read full story at source