যুগে যুগে মানুষ চোয়াল যেভাবে ছোট হয়ে গেল

· Prothom Alo

বয়ঃসন্ধিকালের একটি পরিচিত আতঙ্কের নাম দাঁতে ব্রেস পরা। আঁকাবাঁকা দাঁত সোজা করতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর দাঁতে ধাতব পাত ও তার পেঁচিয়ে রাখতে হয়। অনেক মানুষকেই এই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ইতিহাসের লাখ লাখ বছরের পুরোনো পাতা উল্টালে দেখা যাবে, আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের দাঁত ছিল একদম সোজা ও নিখুঁত! তাদের কোনো ডেন্টিস্ট ছিল না, ব্রেস পরার তো প্রশ্নই আসে না। তাহলে হঠাৎ কী এমন হলো যে আধুনিক মানুষদের দাঁত ঠিক করতে এত ঝক্কি পোহাতে হয়?

বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মধ্যে। না, এই পরিবর্তনে আমাদের দাঁতে কোনো সমস্যা হয়নি। সমস্যাটা হয়েছে এক অদ্ভুত কাঠামোগত অমিলের কারণে। লাখ লাখ বছর ধরে আমাদের দাঁতের আকার একই রয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের চোয়াল আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে গেছে!

Visit newsbetting.cv for more information.

চোয়াল কেন ছোট হলো? এর পুরো দায়ভার আমাদের খাদ্যাভ্যাসের। আদিম যুগের মানুষদের কথা একটু কল্পনা করুন। সে যুগে ব্লেন্ডার বা প্রক্রিয়াজাত খাবার ছিল না। তাদের প্রতিদিনের খাবারে থাকত শিকার করা মাংস, গাছের শক্ত শিকড়, লতাপাতা ও আঁশযুক্ত খাবার। এগুলো চিবানোর জন্য চোয়ালের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ত। এই শক্ত খাবার চিবানো ছিল চোয়ালের জন্য রীতিমতো একটি ব্যায়ামের মতো। অতিরিক্ত চাপের কারণে তাদের চোয়ালের হাড় চারদিকে প্রসারিত হয়ে বড় ও শক্তিশালী হতো। ফলে বড় চোয়ালে প্রতিটি দাঁত সুন্দরভাবে নিজের জায়গা করে নিতে পারত।

বেআক্কেল আক্কেল দাঁত!
আদিম যুগে ব্লেন্ডার বা প্রক্রিয়াজাত খাবার ছিল না। তাদের প্রতিদিনের খাবারে থাকত শিকার করা মাংস, লতাপাতা ও আঁশযুক্ত খাবার। এগুলো চিবানোর জন্য চোয়ালের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ত।

কিন্তু আধুনিক যুগে এসে আমরা ধীরে ধীরে নরম খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। বিশেষ করে শৈশবে যখন আমাদের চোয়ালের গঠন ও বিকাশ হয়, তখন আমরা আপেল সস, পিনাট বাটার বা পাস্তা মতো নরম খাবার খাই। চিবানোর চাপ কমে যাওয়ায় আমাদের চোয়াল আর আগের মতো বড় হওয়ার সুযোগ পায় না।

চোয়াল ছোট হয়ে গেলেও আমাদের জিনগত কারণে দাঁতের আকার কিন্তু সেই আদিম মানুষদের মতোই বড় রয়ে গেছে। ছোট একটি চোয়ালের ভেতর যখন বড় বড় দাঁতগুলো জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করে, তখনই শুরু হয় বিপত্তি। জায়গার অভাবে দাঁতগুলো একটির ওপর আরেকটি উঠে যায়, আঁকাবাঁকা হয়ে যায়। আক্কেল দাঁত ওঠার পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। এমনকি ছোট চোয়ালের কারণে জিহ্বা ও শ্বাসনালির জায়গাও কমে যায়। এ কারণেই আধুনিক যুগে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা বেশি দেখা যায়। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের মধ্যে মানুষের দম বন্ধ হয়ে যায়। দাঁতের এই সমস্যা সমাধান করতে ডেন্টিস্টরা ব্রেস পরিয়ে এই কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করেন।

দাঁতের চিকিৎসার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি বেশ পুরোনো। খ্রিষ্টপূর্ব ৭ হাজার অব্দে সিন্ধু সভ্যতায় দাঁতের চিকিৎসার প্রমাণ পাওয়া যায়! তবে সে আমলের মানুষ মনে করত, দাঁতে ক্ষুদ্র পোকা থাকার কারণেই দাঁত ক্ষয়ে যায়। এই ভ্রান্ত ধারণা ১৭০০ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল! এরপর ফরাসি সার্জন পিয়েরে ফোচার্ড আধুনিক ডেন্টিস্ট্রির সূচনা করেন। তিনি চিনিকে দাঁত ক্ষয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং দাঁত সোজা করার জন্য ঘোড়ার নালের আকৃতির একটি ধাতব পাত আবিষ্কার করেন। ব্যান্ডো নামে এই যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা নির্যাতনের যন্ত্রের মতোই ছিল!

বৃদ্ধ বয়সে দাঁত পড়ে কেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৭ হাজার অব্দে সিন্ধু সভ্যতায় দাঁতের চিকিৎসার প্রমাণ পাওয়া যায়! তবে সে আমলের মানুষ ভাবত, দাঁতে ক্ষুদ্র পোকা থাকার কারণেই দাঁত ক্ষয়ে যায়। এই ভ্রান্ত ধারণা ১৭০০ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল!

১৯০০-এর দশকের শুরুর দিকে এডওয়ার্ড অ্যাঙ্গেল নামে এক ব্যক্তি আধুনিক ব্রেসের ধারণা নিয়ে আসেন। মজার ব্যাপার হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ নাগরিক নিয়মিত দাঁত মাজার অভ্যাসই গড়ে তোলেনি!

ডেন্টিস্ট্রির আরেক যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ফ্লোরাইড। এর আবিষ্কারের গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ। মহামারিবিদ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লোরাইডের আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যক্ষ্মা রোগ! এক ডেন্টিস্ট যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার আশায় কলোরাডো স্প্রিংসের উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় বেড়াতে যান। সেখানে তিনি অদ্ভুত এক ব্যাপার খেয়াল করেন। স্থানীয় মানুষদের দাঁতে বাদামি রঙের ছোপ ছোপ দাগ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাদের কারও দাঁতেই কোনো ক্যাভিটি বা ক্ষয়রোগ নেই!

অনুসন্ধান করে তিনি জানতে পারেন, ওই এলাকার পানিতে প্রাকৃতিকভাবে ফ্লোরাইডের মাত্রা অনেক বেশি। অতিরিক্ত ফ্লোরাইডের কারণে দাঁতে দাগ পড়লেও, এটি দাঁতকে ক্ষয়ের হাত থেকে জাদুর মতো রক্ষা করে। আধুনিক যুগে তাই খাওয়ার পানিতে একটি নির্দিষ্ট ও নিরাপদ মাত্রায় (০.৭ পিপিএম) ফ্লোরাইড মেশানো হয়, যা কোনো দাগ ছাড়াই আমাদের দাঁতকে সুরক্ষিত রাখে।

জন্মের সময় শিশুদের দাঁত থাকে না কেন
ডেন্টিস্ট্রির আরেক যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ফ্লোরাইড। এর আবিষ্কারের গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ। মহামারিবিদ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লোরাইডের আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যক্ষ্মা রোগ!

সুতরাং, আমাদের আঁকাবাঁকা দাঁতের জন্য আধুনিক আরামদায়ক জীবনযাত্রা ও নরম খাবারই মূলত দায়ী। আমাদের জীবনে কাঁচা মাংস ও শক্ত শেকড় চিবানোর দিন যেহেতু আর ফিরে আসবে না, তাই সুন্দর হাসির জন্য ওই ধাতব ব্রেস এখন আমাদের অন্যতম ভরসা!

তবে খুব বেশি মানুষকে কিন্তু দাঁতে ব্রেস পরা অবস্থায় দেখবেন না। কারণ, অনেকেই দাঁতের কাঠামো ঠিক করার জন্য ব্রেস পরতে চান না। ফলে অনেকের দাঁতই আঁকাবাঁকা হয়ে ওঠে। সে দাঁত নিয়ে যদি কারো আক্ষেপ না থাকে, তাহলে ব্রেস পরার তো প্রয়োজন হয় না। এ কারণেই বেশিরভাগ মানুষের দাঁতে ব্রেস পরানো থাকে না।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকাসূত্র: পপুলার সায়েন্সটুথপেস্ট আবিষ্কারের আগে মানুষ কী দিয়ে দাঁত মাজত

Read full story at source