বইয়ের ফেরিওয়ালা
· Prothom Alo

ইমানা ও নিহা খুব ভালো বন্ধু। অমর একুশে বইমেলা শুরু হলে মা–বাবার সঙ্গে বইমেলায় যায়। খুঁজে খুঁজে বই সংগ্রহ করে দুজন দুজনকে উপহার দেয়। একদিন তাদের ক্লাস শিক্ষক নাজমা ম্যাম বলেছিলেন, ‘বই পড়লে মনের জানালা খুলে যায়। সেই জানালা দিয়ে পুরো পৃথিবী দেখা যায়।’ দুই বন্ধু সিদ্ধান্ত নিল, এখন থেকে বইয়ের সাগরে ডুব দিতে হবে।
Visit afnews.co.za for more information.
ইমানা-নিহা ক্লাসের অবসরের ফাঁকে বই পড়া নিয়ে গল্প করছিল। ইমানা স্কুলের লাইব্রেরি এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই সংগ্রহ করে নিয়মিত পড়ে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে পুরস্কারও পেয়েছে।
বার্ষিক পরীক্ষা শেষ, স্কুলে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হবে কয়েক দিন পর। ইমানা ভাবছিল, ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’তে কী চরিত্রে অভিনয় করা যায়। নিহা বলল, ‘“বই পোকা”, “বই ভূত” সাজবি।’ ইমানা বলল, ‘উইপোকা সেজে আমি বই কাটব, আর ভূত সেজে তুই বই গিলে খাবি।’ কথাটা বলেই দুজনে হাসল কিছুক্ষণ। নিহা বলল, ‘শিশুরা ভয় পাবে—এমন অভিনয় করা যাবে না।’
স্কুল ছুটির পর দুজনে বাসায় ফিরে গেল। ইমানা তার নানাভাইকে জিজ্ঞেস করল, ‘নানাভাই, যেমন খুশি তেমন সাজোতে কী অভিনয় করা যায়?’ নানা মনোযোগসহকারে গল্পের বই পড়ছিলেন। পাশে সুবহানা, বর্ণ, জায়ান মিলে মোবাইলে গেমস খেলছিল আর টিকটক তৈরি করছিল।
নানাভাই বই পড়ায় মনোযোগ দিলে বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে খোঁজখবর থাকে না। কেউ কিছু বললে শুনতে পান না। ইমানা কানের কাছে গিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘নানাভাই!’ এবার তিনি নড়ে উঠলেন। ‘স্কুলে যেমন খুশি তেমন সাজোতে অভিনয় করব। কী অভিনয় করা যায় বলো?’
নানাভাই ‘পরীর দিঘিতে ভূতের জাহাজ’ বইয়ে ‘শিশুদের হাতে মোবাইল নয়, বই তুলে দিন’ বাক্যটি মার্কার কলম দিয়ে মার্ক করে রাখলেন। কিছু একটা ভেবে তিনি বললেন—
‘পেয়ে গেছি!’
‘কী?’
‘তুমি বইয়ের ফেরিওয়ালা সাজতে পারো।’
ইমানা একটু চুপ থেকে বলল, ‘নানা, আমি কি বই বিক্রি করব? বইয়ের হকার।’
নানা বলল, ‘না, তুমি বইয়ের পুঁটলি নিয়ে গ্রামে গ্রামে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিতরণ করবে বইপ্রেমীদের মাঝে। বই পড়া শেষ হলে বইগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসবে। তোমার কাঁধে থাকবে বইয়ের থলে, হাতে প্ল্যাকার্ড। কার্ডে লেখা থাকবে “বইয়ের ফেরিওয়ালা—আপনার সন্তানের হাতে মোবাইল নয়, বই তুলে দিন।” হ্যান্ডমাইকে চিৎকার দিয়ে বলবে, “বই লাগবে, বই? মজার মজার গল্প–কবিতা–ছড়ার বই আছে।”’
বিষয়টা ইমানার পছন্দ হলো। জায়ান ও বর্ণ বলল, ‘নানাভাই, আমরাও বইয়ের ফেরিওয়ালা হব, বই বিক্রি করে আইসক্রিম, চকলেট খাব।’
ইমানা তার ছোট ভাইবোনদের বলল, ‘দে মোবাইল দে, যা বই নিয়ে পড়তে বস।’
সুবহানা বলল, ‘আমি এখন থেকে মোবাইল দেখব না।’
পরদিন স্কুলে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’তে ইমানা নীল রঙের শাড়ি পরিধান করে বইয়ের ফেরিওয়ালা সাজল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক, ক্লাস শিক্ষক, সহপাঠী—সবাই তাকে ঘিরে ধরল বইয়ের জন্য। অভিভাবকেরাও মাঠে দাঁড়িয়ে বইয়ের ফেরিওয়ালার কাছ থেকে বই সংগ্রহ করতে চাইল। ইমানা হাসিমুখে সবাইকে বই দিল।
অভিনয় শেষে প্রধান শিক্ষক বক্তব্য শুরু করলেন, ‘শিশুদের কাছ থেকে বড়দের অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা বড়রা ছোটদের সামনে বসে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। বড়রা হাতে বই নিয়ে পড়লে শিশুরাও বই পড়তে আগ্রহী হবে। ইমানা অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শিখিয়ে দিল, শিশুদের হাতে মোবাইল নয় বই তুলে দিন। বই হলো মনের ওষুধ।’
একসময় ফলাফল ঘোষণার সময় এল। স্পিকারে ঘোষণা এল, যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে ইমানা। সবাই করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাল। দূরে দাঁড়িয়ে নানাভাই করতালি দিল। জায়ান, বর্ণ আর সুবহানাকে কানে কানে বলল, ‘আজ থেকে আমরা আর মোবাইল দেখব না। বই পড়ব, ইমানা আপুর মতো আমরাও পুরস্কার পাব।’
উপদেষ্টা, পটিয়া বন্ধুসভা