চাঁদের উল্টো পিঠ থেকে আর্টেমিস ২ নভোচারীদের পাঠানো চোখধাঁধানো সব ছবি

· Prothom Alo

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দূরের মহাকাশযাত্রা! ঐতিহাসিক লুনার ফ্লাইবাইয়ের পর আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারী চাঁদের উল্টো পিঠ থেকে পাঠিয়েছেন অবিশ্বাস্য সুন্দর সব ছবি। লুনার ফ্লাইবাই মানে চাঁদের পাশ ঘেঁষে উড়ে যাওয়া।

Visit rouesnews.click for more information.

কী নেই সেই ছবিতে! চাঁদের দিগন্ত ঘেঁষে পৃথিবীর উঁকি দেওয়া, মহাকাশের বুকে বিরল সূর্যগ্রহণ এবং চাঁদের উল্টো পিঠের ভূপ্রকৃতির দারুণ সব হাই-রেজ্যুলেশনের ছবি। আমাদের দিক থেকে চাঁদের যে পিঠটা দেখা যায়, উল্টো পিঠটা তার চেয়ে একদম আলাদা; সেখানে শুধু গর্ত আর গর্ত!

চাঁদের আড়ালে চলে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে নভোচারীদের থেকে হারিয়ে যেতে বসা পৃথিবীর একটি দৃশ্য।

বাংলাদেশ সময় গত মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল টানা সাত ঘণ্টা ধরে এই ফ্লাইবাইয়ের রোমাঞ্চকর ঘটনাটি ঘটে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবীর সঙ্গে নভোচারীদের রেডিও যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল। কারণ, চাঁদ নিজেই তখন সিগন্যাল আটকে বিশাল এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল!

ওরিয়ন স্পেসক্রাফট ইন্টিগ্রিটি যখন চাঁদের ঠিক পেছনে, তখন চার নভোচারী মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন মেতে ওঠেন চাঁদের ওই অদেখা পিঠের ছবি তোলায়। মিশনের এই অংশেই নভোযানটি চাঁদের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছায়; পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬ হাজার ৫৪৫ কিলোমিটার ওপরে! তখন পৃথিবী থেকে তাঁদের সর্বোচ্চ দূরত্ব ছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার।

সবার আগে নিরাপত্তা! সূর্যগ্রহণ দেখার বিশেষ চশমা চোখে নভোচারীরা। ওপরের বাঁ দিক থেকে ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার, রিড ওয়াইজম্যান এবং জেরেমি হ্যানসেন।

চাঁদের আড়াল থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন করার ঠিক পরপরই নভোচারীরা প্রায় এক ঘণ্টা একটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় সূর্য পুরোপুরি চাঁদের পেছনে লুকিয়ে যায়। মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ খুব একটা মেলে না। এই দারুণ সুযোগে তাঁরা সূর্যের করোনা অঞ্চল বা বাইরের বায়ুমণ্ডলের এমন সব চমৎকার ছবি তোলেন, যা সাধারণত সূর্যের তীব্র আলোর কারণে দেখা সম্ভব হয় না।

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় ইন্টিগ্রিটি নভোযান থেকে দেখা চাঁদের চমৎকার এক দৃশ্য।

শুধু কি তাই? সূর্যের ওই তীব্র আলো না থাকায় নভোচারীরা চাঁদের বুকে উল্কাপিণ্ড আছড়ে পড়ার ছয়টি ক্ষীণ আলোর ঝলকানিও নিজেদের চোখে দেখতে পান! চাঁদের এই উল্টো পিঠ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কোনো শেষ নেই। কারণ, আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের যে পিঠ দেখি, উল্টো পিঠটি তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের দিকের পিঠে লাখ লাখ বছর আগের লাভার তৈরি বিশাল, সমতল ও অন্ধকার প্রান্তর আছে। কিন্তু উল্টো পিঠে এমন লাভার প্রান্তর প্রায় নেই বললেই চলে। বরং পুরো জায়গাটি অসংখ্য গর্তে ভরা।

প্রাচীন ও বিশাল হার্টজস্প্রাং বেসিনের প্রান্তে অবস্থিত ভ্যাভিলভ ক্রেটারের একটি ক্লোজ-আপ ছবি।

কেন এই পার্থক্য? এই রহস্যের সমাধান এখনো হয়নি। তবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে করা এই নতুন পর্যবেক্ষণ হয়তো দারুণ কোনো সূত্র এনে দেবে। নাসার বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে পৃথিবীতে বসে এই ছবিগুলো বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছেন।

৮ এপ্রিল নাসা তাদের এক আপডেটে জানিয়েছে, ‘ফ্লাইবাইয়ের সময় নভোচারীরা গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি গর্ত, প্রাচীন লাভার প্রবাহ এবং পৃষ্ঠের ফাটলগুলোর ছবি তুলেছেন, যা বিজ্ঞানীদের চাঁদের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন বুঝতে দারুণভাবে সাহায্য করবে। তাঁরা বিভিন্ন ভূখণ্ডের রং, উজ্জ্বলতা এবং গঠনের পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেই সঙ্গে পৃথিবীর অস্ত যাওয়া এবং পৃথিবীর উদয় দেখেছেন। সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের করোনা অঞ্চলের চমৎকার সব ছবি ফ্রেমবন্দী করেছেন।’

সূর্যগ্রহণের আরেকটি দৃশ্য। একদম বাঁ দিকের উজ্জ্বল বস্তুটি আমাদের পরিচিত শুক্র গ্রহ।

ওরিয়ন স্পেসক্রাফট এখন তার এই মহাকাব্যিক যাত্রার ফিরতি পথে রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোববার, ১২ এপ্রিল এটি প্রশান্ত মহাসাগরে, ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর উপকূলে আছড়ে পড়বে। বায়ুমণ্ডলে তীব্র গতিতে প্রবেশের এই সময়টিই হতে যাচ্ছে পুরো মিশনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ!

ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের তোলা অসাধারণ এক দৃশ্য। নভোযানটির ডান দিক সূর্যের আলোয় আলোকিত। তার ঠিক পেছনেই উঁকি দিচ্ছে আধখানা চাঁদ। ডান দিকে চাঁদের তুলনায় ছোট্ট বিন্দুর মতো একফালি পৃথিবী ঠিক যেন চাঁদের দিগন্তের নিচে অস্ত যাওয়ার অপেক্ষায়!

এই মিশন থেকে পাওয়া তথ্য নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রামের পরবর্তী ধাপগুলোতে দারুণ কাজে লাগবে। প্রায় ১০ দিনের এই যাত্রা ভবিষ্যতের নভোচারীদের জন্য নভোযান এবং মিশনের নকশাকে আরও নিখুঁত করতে সাহায্য করবে। পরবর্তী ধাপ, অর্থাৎ আর্টেমিস ৩ মিশনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০২৭ সাল। সেটি হবে পৃথিবীর একটু কাছাকাছি। সেখানে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বাণিজ্যিক মহাকাশযানের সঙ্গে ডকিং হওয়ার কৌশল পরীক্ষা করা হবে। এরপর ২০২৮ সালের শুরুতে আর্টেমিস ৪ মিশনে নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অবতরণ করবেন এবং সেখান থেকে গবেষণার জন্য নমুনা সংগ্রহ করবেন।

৭ এপ্রিল ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের জানালা দিয়ে তোলা পৃথিবীর উদয়।

তবে ভবিষ্যতের সেই মিশনগুলোর কথা বাদ দিলেও, আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীদের আনা এই বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো যেকোনো বিচারেই এক অমূল্য সম্পদ। নাসার সায়েন্স ডিরেক্টরেটের সহযোগী প্রশাসক নিকি ফক্স বলেন, ‘আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারী মানবজাতিকে চাঁদের চারপাশের এক অবিশ্বাস্য যাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা বিজ্ঞানে ভরপুর এত চমৎকার সব ছবি নিয়ে এসেছেন, যা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট, নাসা, স্পেস ডটকম ও সায়েন্টিফিক আমেরিকান

Read full story at source