মানব ইতিহাসে নতুন রেকর্ড, পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাচ্ছে আর্টেমিস ২
· Prothom Alo

পৃথিবী থেকে ঠিক কত দূর পর্যন্ত মানুষের মহাকাশযান পৌঁছাতে পারে? আজ থেকে ৫৪ বছর আগে এই সীমানাটা নির্ধারণ করে দিয়েছিল নাসার অ্যাপোলো ১৩ মিশন। কিন্তু এবার সেই পুরোনো রেকর্ড ভাঙার সময় এসেছে! নাসার ঐতিহাসিক আর্টেমিস ২ মিশন শুধু চাঁদের দিকেই যাচ্ছে না, এটি গড়তে যাচ্ছে মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে দূরে ভ্রমণের এক নতুন রেকর্ড।
Visit moryak.biz for more information.
বাঁ থেকে ডানে জেরেমি হ্যানসেন, ক্রিস্টিনা কচ, রিড ওয়াইজম্যান ও ভিক্টর গ্লোভার৩ এপ্রিল নাসা আনুষ্ঠানিকভাবে এক রোমাঞ্চকর ঘোষণা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, আর্টেমিস ২-এর চার নভোচারী নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭৩ কিলোমিটার দূরে ভ্রমণ করবেন! আগের রেকর্ডটি ছিল ৪ লাখ ১৭১ কিলোমিটার। ১৯৭০ সালের এপ্রিলে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের তিন নভোচারী গড়েছিলেন এই রেকর্ড।
১০ দিনের মিশনে কোন দিন কী করবেন নভোচারীরানাসা জানিয়েছে, আর্টেমিস ২-এর চার নভোচারী নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭৩ কিলোমিটার দূরে ভ্রমণ করবেন!
কবে ভাঙবে এই রেকর্ড
আগামী ৬ এপ্রিল, সোমবার (বাংলাদেশ সময় ৭ এপ্রিল, মঙ্গলবার)। ওরিয়ন ক্যাপসুল যখন চাঁদের উল্টো পাশ দিয়ে ঘুরে পৃথিবীর দিকে তার ফিরতি পথ ধরবে, ঠিক তখনই রচিত হবে এই নতুন ইতিহাস।
আর্টেমিস ২ যে আগের রেকর্ড ভেঙে ফেলবে, তা আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ৩ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে আর্টেমিস ২ মিশনের অ্যাসেন্ট ফ্লাইট ডিরেক্টর জুড ফ্রেইলিং যখন এই দূরত্বের নতুন হিসাবটি প্রকাশ করেন, তখন এর গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। কারণ, এটি কোনো সাধারণ অনুমান নয়; বরং ওরিয়নের ট্রান্সলুনার ইনজেকশন বা ইঞ্জিন বার্ন সফলভাবে শেষ হওয়ার পর করা একদম নিখুঁত হিসাব!
ট্রান্সলুনার ইনজেকশন কী
২ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওরিয়ন সফলভাবে তার টিএলআই ধাপটি সম্পন্ন করেছে। প্রায় ৬ মিনিট ধরে চলা ইঞ্জিনের এই প্রচণ্ড ধাক্কাটিই ক্যাপসুলটিকে পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের দিকে নির্ভুল নিশানায় ছুড়ে দিয়েছে।
নাসার ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের কাল্পনিক ছবিনাসার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ট্রান্সলুনার ইনজেকশন বার্নটিই হলো মিশনের শেষ বড় ইঞ্জিন ফায়ারিং। এটি ওরিয়নকে চাঁদের দিকে এমন এক পথে ফেলে দিয়েছে, যা কোনো অতিরিক্ত জ্বালানি বা ইঞ্জিন ফায়ারিং ছাড়াই নভোচারীদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে সাগরে আছড়ে পড়তে সাহায্য করবে। মিশন শুরুর মাত্র দুদিনের মাথায় এই ধাক্কাটি একাধারে চাঁদের পথে যাত্রার জ্বালানি এবং পৃথিবীতে ফেরার ডিঅরবিট বার্ন হিসেবেও কাজ করছে!
আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীদের তোলা ছবিতে পৃথিবী দেখতে কেমনঅ্যাপোলো ১৩ মিশনের গল্পটা ছিল অন্য রকম। সেই মিশনে তিন নভোচারীর চাঁদে নামার কথা ছিল। কিন্তু উৎক্ষেপণের ৫৬ ঘণ্টা পর অক্সিজেন ট্যাংকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটলে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
অ্যাপোলো ১৩ মিশনের বেঁচে ফেরার লড়াই বনাম আর্টেমিস ২
আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আর্টেমিস ২ মিশনে মানুষ চাঁদে নামবে না, বা চাঁদের কক্ষপথেও প্রবেশ করবে না। এটি শুরু থেকেই এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। চার নভোচারী শুধু চাঁদের পাশ ঘেঁষে উড়ে আসবে। এর মূল লক্ষ্য, ওরিয়ন ক্যাপসুল নভোচারীদের নিরাপদে চাঁদে নিয়ে যেতে এবং ফিরিয়ে আনতে সক্ষম কি না, তা যাচাই করা। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৮ সালের শেষের দিকে আর্টেমিস ৪ মিশনের মাধ্যমে মানুষ আবারও চাঁদের বুকে পা রাখবে।
অ্যাপোলো ১৩ মিশনের তিন নভোচারী কমান্ড মডিউল পাইলট জ্যাক সুইগার্ট, কমান্ডার জিম লাভেল এবং লুনার মডিউল পাইলট ফ্রেড হেইসকিন্তু অ্যাপোলো ১৩-এর গল্পটা ছিল অন্য রকম। সেই মিশনে তিন নভোচারীর চাঁদে নামার কথা ছিল। কিন্তু উৎক্ষেপণের ৫৬ ঘণ্টা পর অক্সিজেন ট্যাংকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটলে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং মিশনটি রূপ নেয় বেঁচে ফেরার এক মরিয়া লড়াইয়ে। কমান্ডার জিম লাভেল, লুনার মডিউল পাইলট ফ্রেড হেইস এবং কমান্ড মডিউল পাইলট জ্যাক সুইগার্ট মিশন কন্ট্রোলের সহায়তায় অসীম সাহসিকতার সঙ্গে চাঁদের পাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। আর সেই বেঁচে ফেরার মহাকাব্যিক লড়াইয়েই, ঘটনাক্রমে তাঁরা গড়েছিলেন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়ার রেকর্ড!
তবে এবার কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত জয়ের মাধ্যমে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের সেই বীরদের রেকর্ড ভাঙতে চলেছে আর্টেমিস ২। মহাকাশের অসীম অন্ধকারে মানুষের সীমানা আরও একবার ছাড়িয়ে যাওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় এখন পুরো বিশ্ব!
সূত্র: স্পেস ডটকমআর্টিমিসের ১০ দিনের চাঁদে অভিযানে মহাকাশে কী কী খাবেন নভোচারীরা