অন্টারিওর জলে ভেসে ওঠা এক শহরের গল্প ২

· Prothom Alo

ব্যস্ত শহর টরন্টোয়, কনফারেন্সের মাঝে পুরনো বন্ধুর সঙ্গে পুনর্মিলনের সঙ্গে যোগ হয় নায়াগ্রা জলপ্রপাতের বিস্ময় এই যাত্রা শুধু পর্যটন নয়, সময় আর অনুভূতির মেলবন্ধন। স্মৃতি, বন্ধুত্ব ও প্রকৃতির মহিমা মিলিয়ে এ এক গভীর, আবেগময় অভিজ্ঞতার গল্প।

পরদিন সকালে আমি আর প্রফেসর খ্রিস্টিয়া হোটেলের লাউঞ্জে নাশতা সেরে হেঁটেই রওনা দিলাম ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির উদ্দেশে। সকালের রোদ বাংলাদেশের অগ্রহায়ণ মাসের মতো, এ তুলনা করাই যেতে পারে। কারণ নরম, স্বচ্ছ আর একধরনের কোমল উষ্ণতায় ভরা। কিন্তু একটু হাঁটার পরই মনে হলো মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছে চৈত্রের প্রখর সূর্য আর ভূমিতে কাঠফাটা রোদ। শহর যেন মুহূর্তেই ঋতু বদলে ফেলেছে। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল সারি সারি হলুদ রঙের স্কুলবাস। ব্রিটেনে স্কুলবাস তেমন চোখে পড়ে না। হলুদ বাসগুলো দেখেই মনে পড়ল, নচিকেতার নস্টালজিয়ায় ভরপুর সেই গান, নয়টার সাইরেন, লাল ফিতা সাদা মোজা আর স্কুলের ইউনিফর্ম। তবে বাসগুলো সাধারণ ট্রাফিকের জন্য আতঙ্ক।

Visit sportbet.reviews for more information.

ট্রাফিকের জন্য আতঙ্ক এই স্কুল বাস

শিশুদের নিরাপত্তার জন্য শুধু চলন্ত অবস্থায়ই নয়, বরং থেমে থাকা অবস্থায়ও এসব বাসকে ওভারটেক করা বেআইনি। সাধারণত বাসগুলোর জন্য বিশেষ ডিপো রয়েছে। যখন বাসগুলো রাস্তায় নামে বা থেমে থাকে ছাত্রদের তোলার জন্য, তখন গোটা রাস্তার দুদিকের ট্রাফিক থেমে থাকে। অন্যথায় জরিমানা গুনতে হয় চার শ থেকে দুই হাজার কানাডিয়ান ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় পঁয়ত্রিশ হাজার থেকে এক লাখ ছিয়াত্তর হাজার টাকা। শুধু যাঁরা প্রথমবার এ ভুল করেছেন, তাঁদের জন্য। দ্বিতীয়বার সমান ভুলের মাশুল যে গুণতে হবে সেটা সহজেই অনুমেয়।

কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিন আমার জন্য খুবই আনন্দের, আবার একধরনের ব্যক্তিগত উত্তেজনায়ও ভরা। কারণ গত রাতে প্রায় আট শ কিলোমিটার দূরের মার্কিন শহর নিউ জার্সি থেকে নয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে প্রিয় বন্ধু রুবেল এসেছে টরন্টোয়। আজ বিকেল চারটায় দেখা হবে তার সঙ্গে। দীর্ঘ তেরো বছর পর। সময় যেন হঠাৎ করে নিজের ভার অনুভব করিয়ে দেয়। রুবেল আর আমার বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়, যেখানে কৈলাসটিলার গ্যাসক্ষেত্রের ধোঁয়া আকাশ স্পর্শ করে অহর্নিশ। যেখানে সুরমা, কুশিয়ারা, কুঁড়া আর দেওরভাগা নদী ছুটে চলে হাওরের পানে, এসব স্মৃতিই যেন আমাদের বন্ধুত্বের অদৃশ্য সেতু।

বন্ধুর সঙ্গে বহুদিন পরে

রুবেলের সঙ্গে স্কুল বা কলেজজীবনে পরিচয় ছিল না। পরিচয় হলো গণিতের কারণে। সংখ্যা আর সমীকরণের মধ্য দিয়েই যেন আমাদের বন্ধুত্বের শুরু। আমরা দুজনই একই গণিত বিভাগে পড়েছি। তারপর আমি চলে আসি লন্ডনে, সে থেকে যায় দেশে। বছর তিনেক পরে সেও আসে লন্ডনে। এরপর একসঙ্গে একই জায়গায় দুজনে কাজ করেছি, একই বাড়িতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত থেকেছি। আমি পিএইচডি শুরু করার আগে একবার মাথায় ঝোঁক এল চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পড়ার। দুজন ভর্তি হলাম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তেরোটা পরীক্ষার মধ্যে পাঁচটা পরীক্ষায় পাসও করলাম। তারপর আর ভালো লাগেনি, তাই অ্যাকাউন্ট্যান্ট আর হয়ে ওঠা হয়নি। গীতার শ্লোকের একটি কথা মনে পড়ে যায়—‘যা হয়েছে ভালো হয়েছে, যা হবে, ভালোই হবে’।

যাহোক, ২০১৩ সালে রুবেল চলে আসে আমেরিকায়। মোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করে এখন নিউ জার্সিতে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ও টিম ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে একটি টেক কোম্জলতে। জীবন আমাদের দুজনকে দুই মহাদেশে নিয়ে গেলেও বন্ধুত্বের সরলরেখাটা অবিকলই থেকে গেছে।

বন্ধু আসছে বহুদিন পরে, আহা কী আনন্দ আকাশে–বাতাসে। কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিন কাটে প্রচণ্ড ব্যস্ততায়। বিকেলে রুবেল আসে ক্যাম্পাসে। তার গাড়িতে করেই ফিরি হোটেলে। সেখান থেকে সোজা লেক অন্টারিওতে। বিকেলে শহরের ভেতরে প্রচণ্ড গরম থাকলেও লেকের ঠান্ডা হাওয়া আর নীল জলরাশি ছড়িয়ে দিচ্ছিল অদ্ভুত এক মিষ্টতা, যা কেবল অনুভব করা যায়, ভাষায় পুরোটা ধরা যায় না। এটাকে কেবলই তুলনা করা যায় স্কন্ধ পুরাণে বর্ণিত মানস সরোবরের সঙ্গে। কৈলাশ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত সেই সরোবরে স্নান করলে শুধু পাপমোচনই হয় না, দিব্যজ্যোতিও লাভ করা যায়। প্রচণ্ড লু হাওয়ার মধ্যে অন্টারিও লেকের সেই হাওয়া সত্যিই যেন দিব্যজ্যোতি ছড়িয়ে দিচ্ছিল আপাদমস্তক।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সামনে দুই বন্ধু

সেখান থেকে বেরিয়ে দুই বন্ধু গেলাম টরন্টোর বাঙালি পাড়া ড্যানফোর্থে। অনেকটাই গারে দু নর্দ বা লন্ডনের ব্রিকলেনের মতো। পশ্চিমের সব শহরেই বাঙালিরা ছোট করে একটা বাংলা টাউন বানাতে চায়—নিজস্ব ভাষা, খাবার আর সংস্কৃতির ছোট্ট আশ্রয়। সেটা মোটেই খারাপ নয়। কিন্তু প্রায় প্রতিটা বাংলা টাউনই শহরের অন্যান্য এলাকা থেকে আবর্জনাময়, এটা একধরনের আত্মসমালোচনার জায়গা। এটা শুধুই যে বাংলাদেশি–অধ্যুষিত এলাকায় হয় তেমন নয়, পাকিস্তানি, ভারতীয় বা আফ্রিকান–অধ্যুষিত এলাকারও প্রায় একই অবস্থা। ড্যানফোর্থ থেকে আরও একটু দূরে একটা রেস্টুরেন্টে ভরপেট ডিনার শেষে আবারও দেখা হলো উজ্জ্বলদা আর সিন্ধুদার সঙ্গে। খানিকটা আড্ডা দিয়ে ধরি হোটেলের পথ। আগামীকাল কনফারেন্সের শেষ দিন, সকালে কনফারেন্স থেকে বিদায় নিয়ে যাব বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাত দর্শনে।

সকাল ১০টার দিকে বন্ধু রুবেল গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসে হাজির। দুই বন্ধু ছুটি নায়াগ্রার উদ্দেশে। দারুণ ঝলমলে দিন। আকাশ পরিষ্কার, উজ্জ্বল রোদ। গাড়ি চলছে লেক অন্টারিওর বিস্তীর্ণ কূল ঘেঁষে। একটু পরপরই দুচোখ যত দূর যায়, তত দূর দেখা যাচ্ছিল নীল দিগন্ত। জল আর আকাশের সীমারেখা যেন মিলিয়ে যাচ্ছে একে অপরের ভেতরে। দুপুর বারোটার দিকে আমরা পৌঁছাই নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কারপার্কে। বাইরে প্রচণ্ড গরম, সেই সঙ্গে চরম উত্তেজনা।

বিস্তৃীর্ণ জলরাশি

নবম–দশম শ্রেণিতে ভূগোলে পড়েছিলাম নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কথা। পড়েছিলাম সপ্তাশ্চর্যের কথা, যেখানে নায়াগ্রার জলপ্রপাতের কথা লেখা ছিল। পুরো শরীরে অদ্ভুত এক উত্তেজনা আর প্রাণে রণিত হচ্ছিল মান্নাদের সেই গান—‘যদি নায়াগ্রা জলপ্রপাত, একদিন সাহারার কাছে চলেও যায়, তবুও তুমি আমার…’।

দুপুরের কাঠফাটা রোদ গায়ে মেখে যখন আমি নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সামনে দাঁড়ালাম, তখন শুধু এক ঝরনার শব্দই নয়, মনে হলো যেন হাজার বছরের ইতিহাস আমার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গর্জন করে নেমে আসা জলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল, এই সৌন্দর্যের শুরু আজ নয়, প্রায় ১২ হাজার বছর আগের এক দীর্ঘ যাত্রা। শেষ বরফ যুগে এই পুরো অঞ্চলই ছিল বিশাল বরফের চাদরে ঢাকা। সময়ের সঙ্গে যখন সেই বরফ গলতে শুরু করে, তখন সৃষ্টি হয় অসংখ্য হ্রদের, যাদের আমরা আজ গ্রেট লেকস নামে চিনি। হ্রদগুলোর অতিরিক্ত জল একসময় নিজের পথ খুঁজে নিতে শুরু করল আর সেই পথই ধীরে ধীরে গড়ে তোলে নায়াগ্রা রিভার।

টিউব স্টেশনে

আমি দাঁড়িয়ে আছি যেখানে, ঠিক সেখান দিয়েই সেই জল একসময় প্রথমবারের মতো নিচে পড়ে আর জন্ম হয় একটি নতুন জলপ্রপাতের। তখনকার সেই প্রপাত আজকের জায়গায় ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবল জলর ধাক্কায় পাথর ক্ষয়ে ক্ষয়ে প্রপাতটি ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে এসেছে। প্রচণ্ড ঝরনার ক্ষুদ্র জলের তৈরি কুয়াশা মুখে লাগছিল আর মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি জায়গা দেখছি না, আমি সময়ের এক দীর্ঘ গল্পের অংশ হয়ে গেছি। এখানে প্রতিটি ফোঁটা জল যেন সেই প্রাচীন বরফ গলার স্মৃতি বহন করে আজও নিরন্তর ছুটে চলেছে। মনে পড়ল আমাদের সেই আটপৌরে মাধবকুণ্ড ঝরনার কথা। প্রথম গিয়েছিলাম সেই সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়।

সেই কিশোর বয়সে মাধবকুণ্ডও ঠিক এভাবেই ধরা দিয়েছিল মানসপটে। অপার বিস্ময়ে প্রায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম শয়ে শয়ে পর্যটকের ভিড়ে। মার্কিন মুলুকের বিপুল জলরাশি যেন মহাবিশ্বের কৃষ্ণগহ্বরের মতো তুমুল উৎসাহে নিজেকে বিসর্জন দিচ্ছে নায়াগ্রা নদীতে।

গোটা দিনটা আমরা দুই বন্ধু উদ্‌যাপন করলাম বন্ধুত্ব, উদ্‌যাপন করলাম নায়াগ্রার উন্মত্ত জলরাশি। এবার হোটেলে ফেরার পালা। ফিরতি পথে বিশাল শপিং এরিয়া আউটলেট কালেকশন থেকে শপিং এবং দুপুরের খাবার শেষে হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা ছয়টা। রুবেলকে বিদায় দিয়ে খানিক বিশ্রাম নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম হোটেল ওয়েস্টিনের উদ্দেশে, কনফারেন্সের গালা ডিনারে যোগ দিতে। ডিনার শেষে আড্ডায় আবারও যোগ দিলেন উজ্জ্বলদা, সিন্ধুদা আর টরন্টোর বন্ধুরা। আড্ডা শেষে গভীর রাত ফিরলাম হোটেলে। প্রচণ্ড ব্যস্ত দিনের শেষে এবার দরকার লম্বা ঘুম।

সকালে উঠে নাশতা সেরে বেরিয়ে পড়লাম উজ্জ্বলদার বাড়ির উদ্দেশে। মধ্যাহ্নভোজ শেষে যাত্রা শুরু হবে বিমানবন্দরের দিকে, কারণ এই অভিযাত্রায় আজই টরন্টোয় আমার শেষ দিন। দুপুরে উজ্জ্বলদার বাড়িতে ইলিশ মাছ আর নানা পদের দেশি খাবার দিয়ে আহার পর্ব শেষে খানিক ভাতঘুম দিয়ে উঠেই দেখি, বন্ধু রুবেল গাড়ি নিয়ে উপস্থিত। দুই বন্ধু টিম হর্টনসের কফিতে চুমুক শেষ করে ধরি বিমানবন্দরের পথ।
রাত বারোটায় আমার বিমান ছাড়ে লন্ডনের উদ্দেশে। সামনে আটলান্টিকের বিপুল জলরাশি; অসীম, অচেনা অথচ পরিচিত। আর ওপারেই আমার বাস। ওপারেই আমার দুই প্রাণভোমরা আরুষি আর আরিয়া। জীবনের সব যাত্রায় শেষ পর্যন্ত আমার পথ সেখানেই ফিরে যায়। (শেষ)
ছবি: লেখক

Read full story at source