এক দুর্ঘটনায় একই গ্রামের পাঁচজন নিহত, বাড়িতে বাড়িতে শোক
· Prothom Alo
‘হামার বউ, ছোল সগি গেল। তিন বছর আগোত ব্যাটাক বিয়া করাচি, ব্যাটার শাশুড়িও মরি গেল। একসাতে সকলে মরল। হামরা একন কাকে নিয়ে বাঁচমো। কেটা হামাক ভাত আন দিবে। ছোলটে আর বাপ কয়া ডাকপ্যার নয়। তোমরা হামার বউ-ছোলোক আনি দাও।’
Visit lebandit.lat for more information.
আজ শনিবার সকালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের নার্গিস বেগমের স্বামী মো. হামিদুজ্জামান। দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রী, ১১ বছর বয়সী সন্তান নীরব মিয়া ও বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা বেগম (৩৫) নিহত হয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত পাঁচজনই গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। আজ সকাল আটটার দিকে তাঁদের মরদেহ নিজপাড়া গ্রামে পৌঁছায়।
চোখের নিমেষে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল কয়েকটি জীবননিহত ব্যক্তিরা হলেন নিজপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামানের স্ত্রী নার্গিস বেগম (৩৫), তাঁর ছেলে নীরব মিয়া (১১), আজিজার রহমানের ছেলে সুলতান মিয়া (৩০), আবদুর রশিদের মেয়ে রিপা খাতুন (২০) এবং জাকির হোসেনের স্ত্রী ও নীরব মিয়ার শাশুড়ি দোলা বেগম (৩৫)। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুটি বাদে সবাই পোশাকশ্রমিক।
আজ সকালে নিজপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামজুড়ে শোকাবহ পরিবেশ। নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে চলছে আত্মীয়স্বজনের আহাজারি। আশপাশের লোকজন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়েছেন হামিদুজ্জামানের স্ত্রী, সন্তান ও ছেলের শাশুড়ি। আজ সকালে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নিজপাড়া গ্রামেনিজপাড়া গ্রামের নিহত রিপা বেগমের বাড়িতে চলছিল আহাজারি। চার বছর ধরে টাঙ্গাইলের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন রিপা। তাঁরা পাঁচ ভাইবোন। মেয়ের মৃত্যুতে রিপার বাবা আবদুর রশিদ কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি কৃষক মানুষ। কোনোমতে সংসার চলে। আমার মেয়ে রিপার বিয়ে হয়নি। সে চার বছর ধরে পোশাক কারখানায় চাকরি করছে। আশা ছিল, কিছুদিন পর মেয়েকে বিয়ে দেব। সব আশা মাটি হয়ে গেল।’ এ সময় রিপার মা বিলকিস বেগম নির্বাক বসে ছিলেন।
তেল শেষ হওয়ায় থেমে ছিল বাস, যাত্রীরা নেমে বসে ছিলেন রেললাইনেনিজপাড়া গ্রামের আরেক নিহত সুলতান মিয়ার বাড়িতেও চলছে আহাজারি। তাঁর বাবা আজিজুর রহমান ও মা শাহানা বেগম পাশাপাশি বসে কাঁদছিলেন। শাহানা বেগম বলেন, ‘আমি ছেলেটাকে বলেছিলাম, এলাকাতে কাজ কর, চাকরি করতে নিষেধ করেছিলাম। চাকরি করতে না গেলে আমার ছেলেটা মরত না।’
ঘরের পাশে আঙিনায় মুখে কাপড় দিয়ে কাঁদছিলেন নিহত সুলতানের স্ত্রী শামসুন্নাহার। তিনি বলেন, ‘আমার সোয়ামি কেমন করে মরল, তোমরা হামার সোয়ামিক আনি দাও।’
সুলতানের বাবা আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলেটা চাকরি করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাত। সেই টাকায় আমাদের সংসার চলত। এখন কে টাকা পাঠাবে।’ নিহত সুলতানের তিন বছর বয়সী মেয়ে নাজিফা তখন শুধু বাবাকে খুঁজছিল।
গতকাল রাত আটটার দিকে ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেংগর এলাকায় পৌঁছালে বাসটির তেল ফুরিয়ে যায়। তখন বাসটি মহাসড়কের পাশে থেমে যায়। এ সময় বাসের কয়েকজন যাত্রী নিচে নেমে পাশের রেললাইনে বসে ছিলেন। ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন তাঁদের ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনে কাটা পড়ে মা-ছেলেসহ পাঁচজন নিহত হন।