মুভিতে মঙ্গলে টিকে থাকার ব্যাপারে যেসব ভুল জিনিস দেখানো হয়
· Prothom Alo

হলিউডের দ্য মার্শিয়ান, ফর অল ম্যানকাইন্ড মুভিগুলো দেখলে মনে হয়, মঙ্গল গ্রহে টিকে থাকা কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু নয়। একটু বুদ্ধি ও সাহস থাকলেই বুঝি পৃথিবীর মতোই সেখানেও দিব্যি বসতি গড়া যায়! কিন্তু বাস্তব চিত্রটা একদম অন্য রকম। মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ মানুষের জন্য শুধু বৈরীই নয়, বরং মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো ভয়ংকর। সেখানে বাস করতে হলে আমাদের কোনো খোলা প্রান্তর নয়, বরং ডুবোজাহাজের মতো চারদিক থেকে পুরোপুরি সিল করা কোনো সুরক্ষিত কাঠামোর ভেতর থাকতে হবে। মঙ্গলে টিকে থাকার আসল চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? মুভিগুলো আমাদের কোথায় কোথায় ভুল তথ্য দেয়?
মঙ্গলের মাটির ওপরেই বাড়ি বানানো যাবে
মুভিতে দেখানো হয়, মঙ্গলকে সহজেই পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য করা যায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে টেরা ফর্মিং। কিন্তু এটি প্রায় অসম্ভব। এর জন্য মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের চাপ প্রায় ২০০ গুণ বাড়াতে হবে এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও তাপমাত্রার ব্যবস্থা করতে হবে। মঙ্গলের মাটিতে বা বরফের নিচে এত পরিমাণ গ্যাসই নেই। কোনোভাবে যদি তা সম্ভবও হয়, তবে এতে হাজার হাজার বছর লেগে যাবে!
Visit sweetbonanza-app.com for more information.
মুভিতে দেখানো হয়, মঙ্গলকে সহজেই পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য করা যায়। কিন্তু এটি বাস্তবে প্রায় অসম্ভবসবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো বিকিরণ। মঙ্গলে পৃথিবীর মতো কোনো চৌম্বকক্ষেত্র নেই। তাই সূর্য ও মহাকাশের প্রাণঘাতী বিকিরণ সরাসরি সেখানে আছড়ে পড়ে। মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়তে হলে তা মাটির অনেক নিচে কিংবা লাভার তৈরি কোনো সুড়ঙ্গের ভেতর বানাতে হবে। আর ওপরে বানাতে হলে মঙ্গলের মাটি দিয়ে তৈরি অনেক পুরু ইটের দেয়াল দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে ঘর।
মঙ্গল গ্রহের প্রাণ নাকি ভুল করে মেরে ফেলেছে নাসা, দাবি গবেষকদেরমুভিতে দেখানো হয়, মঙ্গলকে সহজেই পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য করা যায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে টেরা ফর্মিং। কিন্তু এটি প্রায় অসম্ভব। এর জন্য মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের চাপ প্রায় ২০০ গুণ বাড়াতে হবে।
মঙ্গল ঠান্ডা মরুভূমি
মুভিতে অনেক সময় দেখানো হয়, মানুষ সাধারণ পোশাক পরেই মঙ্গলে অল্প সময়ের জন্য বের হচ্ছে এবং তাদের কিছুই হচ্ছে না! কিন্তু বাস্তব হলো, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ। এর ৯৫ শতাংশই হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড। সেখানে বাতাসের চাপ এতই কম যে, আপনি শ্বাস নেওয়ারই কোনো সুযোগ পাবেন না!
দ্য মার্শিয়ান মুভির দৃশ্যঠান্ডার কথা তো না-ই বা বললাম! মঙ্গলের গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাতে এই তাপমাত্রা মাইনাস ৮৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। এই কনকনে ঠান্ডায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষের শরীর জমে বরফ হয়ে যাবে। তাই সেখানে টিকে থাকতে হলে সার্বক্ষণিক তাপ ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে বিশাল পরিমাণ শক্তি।
কম গ্র্যাভিটি মানেই সুপারম্যানের মতো লাফঝাঁপ
জন কার্টার মুভিতে দেখা যায়, মঙ্গলের কম গ্র্যাভিটির কারণে নায়ক সুপারম্যানের মতো লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। মঙ্গলের গ্র্যাভিটি পৃথিবীর মাত্র ৩৮ শতাংশ। শুনতে মজার মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি মানুষের শরীরের জন্য ভয়ংকর।
মঙ্গলের কম গ্র্যাভিটিতে সুপারম্যানের মতো লাফ দেওয়া প্রায় অসম্ভববিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এমন কম গ্র্যাভিটিতে থাকলে মানুষের হাড়ের ঘনত্ব প্রতি মাসে ১ থেকে ১.৫ শতাংশ হারে কমতে থাকে! পেশি দুর্বল হয়ে যায় এবং হৃৎপিণ্ডে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এই ক্ষতি এড়াতে নভোচারীদের প্রতিদিন কঠোর ব্যায়াম করতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এমন পরিবেশে জন্ম নেওয়া কোনো শিশু কি কখনো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে? এর উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের অজানা।
মঙ্গল গ্রহে সময় পৃথিবীর চেয়ে দ্রুত চলে, কিন্তু কেনমঙ্গলের গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাতে এই তাপমাত্রা মাইনাস ৮৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। এই কনকনে ঠান্ডায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষের শরীর জমে বরফ হয়ে যাবে।
মঙ্গলের মাটিতে সহজেই আলু ফলানো যাবে
দ্য মার্শিয়ান মুভিতে নায়ককে মঙ্গলের মাটিতে খুব সহজেই আলু ফলাতে দেখা যায়। কিন্তু মুভিতে একটা বড় সত্য এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। মঙ্গলের মাটিতে পারক্লোরেট নামে এক ভয়ংকর বিষাক্ত রাসায়নিক লবণ মিশে আছে। পৃথিবীতে এই উপাদানটি রকেটের জ্বালানি বা আতশবাজি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়!
দ্য মার্শিয়ান মুভিতে নায়ককে মঙ্গলের মাটিতে খুব সহজেই আলু ফলাতে দেখা যায়এই বিষাক্ত মাটিতে কোনো গাছ জন্মাবে না। মঙ্গলে ফসল ফলাতে হলে আগে বিশেষ ব্যাকটেরিয়া বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় মাটি থেকে এই বিষ দূর করতে হবে। খোলা মাঠের বদলে মঙ্গলের খামারগুলোকে দেখতে হবে অত্যাধুনিক কোনো বায়োটেক ল্যাবরেটরির মতো। সেখানে পানির প্রতিটি ফোঁটা বারবার ব্যবহার করার নিখুঁত ব্যবস্থা থাকতে হবে।
মঙ্গলে পৌঁছানোটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
অনেকেই ভাবেন, মঙ্গলে যাওয়ার রকেট বানানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মনস্তত্ত্ব। মঙ্গলে যেতে এবং আসতে অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। এই বিশাল সময় ধরে পরিবার থেকে দূরে, ছোট একটি আবদ্ধ জায়গায় থাকার একঘেয়েমি মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিতে পারে।
মঙ্গলে যাওয়ার জন্য রকেট বানানোর চেয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মনস্তত্ত্বমঙ্গলে যাওয়ার পথে একসময় যখন পৃথিবীটা চোখের আড়াল হয়ে একটি বিন্দুর মতো মিলিয়ে যাবে, তখন নভোচারীদের মনে চরম হতাশা কাজ করতে পারে। তারা জানবেন যে কোনো বিপদ হলে কেউ তাদের বাঁচাতে আসবে না। প্রতিদিন একই খাবার খাওয়া, একই বাতাস নেওয়া এবং চারদিকে একই লাল দৃশ্য দেখার কারণে তৈরি হওয়া বিষণ্ণতা কাটানোটা শারীরিক সুস্থতার মতোই জরুরি।
মঙ্গল গ্রহে সময় দ্রুত চলে, কিন্তু কতটা দ্রুতমঙ্গলের মাটিতে পারক্লোরেট নামে এক ভয়ংকর বিষাক্ত রাসায়নিক লবণ মিশে আছে। পৃথিবীতে এই উপাদানটি রকেটের জ্বালানি বা আতশবাজি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়!
তাহলে কি সত্যিই মঙ্গলে টিকে থাকা সম্ভব
প্রযুক্তিগতভাবে মঙ্গলে টিকে থাকা হয়তো সম্ভব। কিন্তু মুভিতে যেমনটা সহজে দেখানো হয়, বাস্তব তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও ব্যয়বহুল। মঙ্গলে বসবাস করা মানে মঙ্গলের পরিবেশে ঘুরে বেড়ানো নয়, বরং এমন একটি মেশিনের ভেতর আজীবন বন্দি থাকা, যা আপনাকে মঙ্গলের প্রাণঘাতী পরিবেশ থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। একটি ছোট যন্ত্র নষ্ট হলেই ঘটতে পারে নিশ্চিত মৃত্যু!
মুভিতে মঙ্গলে টিকে থাকা যেমনটা সহজে দেখানো হয়, বাস্তব তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিনসবশেষে বলতে চাই, পৃথিবীর মতো এত সুন্দর এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি গ্রহকেই যেখানে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছি, সেখানে মঙ্গলে গিয়ে একদম শূন্য থেকে নতুন একটি বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করার স্বপ্ন দেখাটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি মনে হয় না?
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকাসূত্র: স্পেস ডটকমচাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে মানুষের আগে কোন প্রাণী বসবাস করবে