থানার ভেতরে মা-মেয়েকে পুলিশের মারধরের অভিযোগ, পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে কারাদণ্ড
· Prothom Alo

কক্সবাজারের পেকুয়ায় দুই নারীকে থানায় ডেকে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ওই দুই নারীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ ঘটনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশের দাবি, মারধরের অভিযোগ সত্য নয়। ওই নারীরাই বরং পুলিশ সদস্যদের মারধর করেছেন।
মারধরের শিকার দুই নারী হলেন রেহেনা মোস্তফা (৪২) ও তাঁর মেয়ে জুবাইদা বেগম (২১)। তাঁরা পেকুয়া উপজেলারই বাসিন্দা। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দুজনকে এক মাস করে কারাদণ্ড দেন। এরপর বুধবার সন্ধ্যায় মা-মেয়েকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
Visit xsportfeed.quest for more information.
দুই নারীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এবং আদালত সূত্রে জানা গেছে, জুবাইদা বেগম ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনে ২০২৪ সালে চকরিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের আবেদন হলে আদালত পেকুয়া থানাকে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান পেকুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষ। তিনি ডিসেম্বরেই মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।
মামলার বাদী জুবাইদা বেগমের খালা আমেনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলার প্রতিবেদন পক্ষে দিতে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করেন এসআই পল্লব। পরে আমার স্বর্ণ বন্ধক রেখে আমার বোন ও ভাগনি তাঁকে (এসআই) ২০ হাজার টাকা দেয়। টাকা নেওয়ার পরও তিনি মামলার প্রতিবেদন বিপক্ষে দিয়েছেন। এটা নিয়ে আমার বোন ও ভাগনি খুব হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বিভিন্ন সময় ওই এসআইয়ের সঙ্গে আমার বোন ও ভাগনির এ বিষয়ে কথা-কাটাকাটি হয়েছে।’
আমেনা বেগম আরও বলেন, ‘এরই জের ধরে বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে আমার বোন ও ভাগনিকে থানায় ডেকে নেন এসআই পল্লব। তখন তারা টাকা ফেরত চাইলে এসআইয়ের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দুজনকে একটি কক্ষে আটকে রেখে ব্যাপক মারধর করে পুলিশ। মারধরে দুজন গুরুতর আহত হয়। এ সময় পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে থানায় ডেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। দুজনকে এক মাস করে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
গতকাল দুপুরে কক্সবাজার জেলা কারাগারে বোন ও ভাগনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জানিয়ে আমেনা বেগম বলেন, ‘রেহেনা মোস্তফার মুখ, বাঁ চোখ, দুই হাতের বাহু, বুক, তলপেটে আঘাত করা হয়েছে। জুবাইদা বেগমেরও বাহু, থুতনি, বুকে জখমের চিহ্ন রয়েছে।’
দুই নারীকে মারধরের পর কারাগারে পাঠানো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হলে সংবাদকর্মীদের কাছে কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ পাঠায় পুলিশ। সেখানে দুই নারীকে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে দেখা যায়। পুলিশ সদস্যদের গালাগাল করতেও দেখা যায় তাঁদের। দুই নারী এক পর্যায়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন তাঁদের ধরে এনে থানা ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে বসান পুলিশ সদস্যরা।
ঘটনা প্রসঙ্গে পেকুয়া থানার উপপরিদর্শক পল্লব কুমার ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই দুই নারী খুবই অ্যাগ্রেসিভ ছিলেন। অনেক আগে থেকে আমাকে ভিকটিমাইজ করতে চাচ্ছিলেন। তাঁরা থানায় ঢুকেই আমাকে গালিগালাজ শুরু করেন। পরে ওপরে গিয়ে ওসি স্যারকেও গালিগালাজ করেন। আমাদের নারী কনস্টেবলরা তাঁদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তাঁদের মারধর করেছেন।’
ওই দুই নারীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার প্রসঙ্গে এসআই পল্লব বলেন, ‘ওরা নিজে নিজে থানার দেয়ালে অনেকগুলো বাড়ি খেয়েছেন। এতে তাঁরা আহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে দুজনকেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওই নারীরা থানায় সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন এবং থানায় একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গেও হাতাহাতি করেছেন। থানা থেকে ঘটনাটি অবগত করার পর আমি সেখানে গিয়েছি। পরে তদন্ত করে প্রত্যেককে এক মাস করে সাজা দিয়েছি।’ ইউএনও বলেন, ‘এর আগে ওই নারীরা পেকুয়া সদরের চেয়ারম্যান ও এসি ল্যান্ডের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেছেন।’
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনে জুবাইদা বেগমের করা মামলার আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন মিজবাহ উদ্দিন। ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওই নারীরা খারাপ আচরণ করলে, হামলা করলে, পুলিশ আটক করে মামলা করতে পারে। পরে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠাতে পারে। কিন্তু পুলিশ কেন থানার ভেতরে দুজন নারীকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করল? আবার ইউএনওকে ডেকে এনে সাজা করালেন।’