বাংলার ব্র্যান্ডিংয়ে সোনালি আঁশ: যেতে হবে বহুদূর

· Prothom Alo

‘সোনালি আঁশ’ নামে খ্যাত পাট বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলার কৃষিজীবী সমাজে পাট চাষ একটি ঐতিহ্যবাহী কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ। আমাদের শৈশবে আমরা কবি আহসান হাবীবের একটি শিশুতোষ কবিতা পড়েছিলাম। ‘ইচ্ছা’ নামক সেই কবিতায় ভাই তার বোনের জন্য পাটে বোনা শাড়ি কিনবে বলে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। অনেক পরে বুঝতে পেরেছিলাম, পাটের শাড়ি আসলে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এই যে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতির যে মেলবন্ধন বাংলার পাটকে ঘিরে ছিল—একসময়ের সমৃদ্ধির পাট বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলোচনার দাবি রাখে। পাট দিবসে (৬ মার্চ) সে কথাই তুলে ধরব।

পাটজাত পণ্য: বৈচিত্র্য ও আধুনিকতার সমন্বয়

পাটজাত পণ্য বলতে সাধারণ চোখে প্রথমেই পাটের বস্তার কথা মাথায় আসে। একসময় বাংলার পাটের বস্তা ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে একচেটিয়া দখলদারিত্ব করত। পাট বলতে একসময় শুধু বস্তা ও ব্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা হতো। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনী শক্তির কারণে এর বৈচিত্র্যময় ব্যবহার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

Visit likesport.biz for more information.

ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল অনুসঙ্গ

বর্তমানে আমাদের দেশে পাটের আঁশ থেকে উন্নতমানের কার্পেট ও গালিচা, পর্দার কাপড়, প্রোমোশনাল ব্যাগ তৈরি হচ্ছে। পাটের আঁশ ও তুলার সংমিশ্রণে মিশ্র কাপড় (যেমন জুট-ডেনিম) তৈরি করে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন বাজারে রপ্তানি করা হচ্ছে। হ্যান্ডক্রাফটেড বিভিন্ন জিনিসপত্র, হোম ডেকর আইটেম ইত্যাদি পাটের সুতা ও কাপড় দিয়ে তৈরি করে আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা বাইরের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

জুট জিওটেক্সটাইল

ভূমির ক্ষয়রোধ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কাজে জুট জিওটেক্সটাইল ব্যবহার করা যায়। এটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী একটি প্রযুক্তি।

কৃষি ও খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ

পাটের চট ও বস্তা চা, কফি, আলু, চিনি, বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্য, চালসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

খাদ্যপণ্য তৈরি

পাটের বহুমুখী ব্যবহারের একটি অন্যতম সংযোজন হলো এর মাধ্যমে খাদ্যপণ্য তৈরি করা। পাটপাতা, স্থানীয়ভাবে যা ‘নালতা শাক’ নামে পরিচিত-বাঙালির খাদ্যতালিকায় আবহমানকাল থেকে আছে। পাটপাতার ঔষধি গুণের কারণে বর্তমানে এর গুঁড়া শুকিয়ে বাইরের দেশে রপ্তানির কার্যক্রম চলছে। চীন, জাপান, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাটপাতার স্যুপ জনপ্রিয় হয়ে উঠায় পাটপাতা নিয়ে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

জুট কম্পোজিটস

গাড়ি নির্মাণ, দরজা, আসবাবপত্র, ঘর নির্মাণ, শিল্পে পাট ফাইবার দিয়ে তৈরি কম্পোজিট ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি সাশ্রয়ী, হালকা, পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং সর্বোপরি কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করে।

প্লাস্টিকের বিকল্প

প্লাস্টিক দূষণ আমাদের দেশের একটি অন্যতম প্রধাণ সমস্যা। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই প্লাস্টিক। এর ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। পাটকে ব্যবহার করে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব এক ব্যাগ বের করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান কর্তৃক উদ্ভাবিত ‘সোনালি ব্যাগ’ প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরিকৃত একটি জৈব পলিমার ব্যাগ, যা দেখতে প্লাস্টিকের মতো কিন্তু সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং পচনশীল। আমরা যদি এই প্রযুক্তির যথাযথ সম্প্রসারণ করতে পারি, তাহলে প্লাস্টিক দূষণ থেকে আমাদের দেশকে কিছুটা হলেও রক্ষা করতে পারব।

পরিবেশগত সুবিধা: টেকসই উন্নয়নের সোনালি আঁশ

বায়োডিগ্রেডেবিলিটি

বর্তমানে আমাদের দেশে পরিবেশদূষণ অন্যতম প্রধান একটি সমস্যা। এর পেছনে রয়েছে সিনথেটিক বিভিন্ন পদার্থের ব্যবহার এবং প্রায় অপ্রতিরোধ্য প্লাস্টিক ব্যবহার। এই প্লাস্টিক কিংবা সিনথেটিডেবিলিটির কের ফাইবার শত শত বছর পরিবেশে অবিকৃত অবস্থায় থাকে এবং পরিবেশকে দূষিত করে। এদিক থেকে পাটের তৈরি পণ্যের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য। পাট হলো এমন একটি প্রাকৃতিক আঁশ, যা খুব দ্রুত জৈবভাবে পচে যায় এবং রিসাইকেবল অর্থাৎ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। পাটজাত পণ্য ব্যবহারের পর মাটিতে ফেলে দিলে তা অল্প সময়েই নিজে থেকে পচে যায় এবং কোনো বিষাক্ত অবশিষ্ট পদার্থ মাটিতে থাকে না। পাটজাত পণ্যের এই শতভাগ বায়োডিগ্রেডেবিলিটির কারণে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পাটজাত পণ্যের চাহিদাও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অন্য ফসলের ওপর প্রভাব

পাট চাষে সাধারণত সার ও কীটনাশক কম লাগে। এতে করে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে। পাটগাছের পাতা জমিতে পড়ে তা পরবর্তী সময়ে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। পাটগাছ কাটার পর এর গোড়া ও শিকড় মাটিতেই থেকে যায়। পরবর্তী ফসল করার সময় চাষের মাধ্যমে তা মাটিতেই মিশিয়ে দেওয়া হয়। এতে করে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তী ফসলে পুষ্টি উপাদান যোগ করে ও সারের ব্যবহার কমায়।

শস্যবিন্যাসে অন্তর্ভুক্তকরণ

পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলকে শস্যবিন্যাসে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি করে কোন এলাকার ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি অঞ্চলগুলোয় এক ফসলি, দুই ফসলি, তিন ফসলি শস্যবিন্যাস এবং কিছু ক্ষেত্রে চার ফসলি শস্যবিন্যাস বিদ্যমান আছে। আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় নদ-নদী এবং খাল-বিলের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে এসব জেলার ফসলের নিবিড়তা জাতীয় গড়ের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। এখানকার এক ফসলি জমিতে যদি পাটের (বিজেআরআই দেশি পাট-১০) আবাদ করা যায়, তাহলে এক ফসলি জমিগুলো দুই ফসলি জমিতে পরিণত হবে এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে আমাদের দেশের প্রায় সব জেলায় মাঝারি উঁচু শ্রেণির জমির ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত শস্যবিন্যাস হলো বোরো-পতিত-রোপা আমন। এসব জমিতে দুই ফসলি শস্যবিন্যাসের জায়গায় পাটকে যদি অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে তা তিন ফসলি শস্যবিন্যাসে রূপান্তরিত হবে। এতে করে শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। পাট শস্যবিন্যাসে যুক্ত থাকার কারণে মাটিতে জৈব পদার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা শক্তি বজায় থাকবে।

বিকল্প জ্বালানির উৎস

পাটের একটি পরিবেশবান্ধব দিক হলো জ্বালানি হিসেবে পাটখড়ির ব্যবহার। আবহমান কাল ধরে গ্রামবাংলায় রান্নার জ্বালানি হিসেবে পাটখড়ির ব্যবহার হয়ে আসছে। ঘরের বেড়া বা খুঁটির কাজে পাটখড়ি বহুকাল ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। পরিবেশবিদদের মতে, একটি দেশের মোট আয়তনের শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে বনভূমি আছে শতকরা ৮ থেকে ৯ ভাগ। আমরা যদি কাঠের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পাটখড়ি ব্যবহার করতে পারি, তাহলে তা বৃক্ষনির্ভরতা কমিয়ে বন উজাড় কমাতে সহায়তা করবে এবং বনাঞ্চল রক্ষা করবে। এর পাশাপাশি বর্তমানে পাটখড়ি পুড়িয়ে অ্যাকটিভেটেড চারকোল তৈরি করা হচ্ছে, যা ওয়াটার পিউরিফিকেশনসহ নানা শিল্পে কাজে লাগে। এর মাধ্যমে কাঠের কয়লার বিকল্প সৃষ্টি হয়ে বন সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে।

কার্বন নিঃসরণ কমানো

আঁশজাতীয় ফসল পাট একটি দ্রুত বর্ধনশীল ফসল, যা পরিপক্ব হতে চার থেকে পাঁচ মাস সময় লাগে। পাট বাতাস থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করে বাতাসকে বিশুদ্ধ রাখে এবং ওজোন স্তরকে রক্ষা করে। গবেষণা অনুযায়ী, এক হেক্টর পাটগাছ বৃদ্ধির সময়ে প্রায় ১৫ টন কার্বন ডাই–অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে শোষণ করে এবং ১১ টন অক্সিজেন উৎপাদন করে। বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য পাট ও পাটজাত পণ্যের বহুল ব্যবহারের বিকল্প নেই।

জুট জিওটেক্সটাইল

কৃত্রিম জিওটেক্সটাইলের বদলে জুট জিওটেক্সটাইল একটি চমৎকার জৈব বিকল্প। মাটি রক্ষা, নদীভাঙন রোধ, রাস্তা নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ ইত্যাদি কাজে এটি ব্যবহার করা যায়। পরিবেশবান্ধব এই জুট জিওটেক্সটাইল অত্যন্ত টেকসই, মাটিকে ধরে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন, মাটিতে সহজে মিশে যেতে পারে। এতে করে মাটির গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের নদী অববাহিকায় জুট জিওটেক্সটাইল একটি কার্যকরী ও সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

পাটের অর্থনীতি

একসময় পাট ও পাটজাত পণ্য ছিল বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। সত্তর দশকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা ৮০ ভাগের বেশি এসেছে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। আমরা যদি স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়কাল বিবেচনা করি, তাহলে দেখতে পাবো ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে শুধু কাঁচা পাট ও পাটজাতীয় দ্রব্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৩১ কোটি ৩১ লাখ ডলার। অর্থাৎ মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা প্রায় ৯০ভাগ এসেছে পাট থেকে। সত্তরের দশকে পাট আমাদের দেশের অর্থনীতিকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, পাটকে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সময় গড়াতে থাকল। পাটের রমরমা অবস্থা কমতে থাকলো। আশির দশকে সিনথেটিক বস্তা ও নাইলনের দড়ির বাজার বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের চাহিদা কমতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে আমাদের রপ্তানি আয়ে। এর পরের ইতিহাস পাট খাত ও পাটচাষিদের জন্য শুধুই হাহাকারের। আশির দশকেই সরকার পাট খাতে সংস্কার আনতে শুরু করে। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অলাভজনক কিছু পাটকলকে বেসরকারীকরণ করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত অধিকাংশ পাটকল একে একে মুখ থুবড়ে পড়তে থাকে। দক্ষ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, যুগোপযোগী প্রযুক্তি, শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক প্রভাব ইত্যাদির কারণে সরকারি পাটকলগুলো বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি।

এখন একটু বর্তমান পরিস্থিতির দিকে নজর দিই। সাম্প্রতিককালে পরিবেশবান্ধব সামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্য নিয়ে নতুন করে সম্ভাবনার দ্বার খোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পথ সৃষ্টি হয়েছে। একটু পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া যাক। বিগত চার অর্থবছর ধরে দেশের পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১২ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৯১ কোটি ১৫ লাখ ডলারে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আরো কমে যায়। এবার তা দাঁড়ায় ৮৫ কোটি ৫২ লাখ ডলারে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় নেমে আসে ৮২ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে। বিশ্ববাজারে প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণের প্রবণতা বৃদ্ধি ও পরিবেশ সচেতনতা ইস্যু জোরদার হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আগামী দিনগুলোয় পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার বৃদ্ধি পাবার প্রবণতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান IMARC–এর পূর্বাভাস আমাদের পাটের ভবিষ্যৎ বাজার সম্বন্ধে একটি ধারণা দেয়। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বে পাটের ব্যাগের বাজার ৩.৮৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে এবং এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে শতকরা ১০ ভাগেরও বেশি। এই যে অর্থনৈতিক বাজার, এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

পাট চাষ সম্প্রসারণ, পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, উন্নত পাটবীজ সরবরাহ ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করে ২০১৭ সালে ‘জাতীয় পাটনীতি’ প্রণয়ন করা হয়। পাটচাষিরা কৃষিঋণ, পাটের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালে পাটকে ‘কৃষিপণ্য’ হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। এর পাশাপাশি ২০২৩ সালকে ‘পাটপণ্য বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার সারা বছরব্যাপী দেশে-বিদেশে পাট পণ্যের প্রদর্শনী ও প্রচারণা চালিয়েছিল। এত আয়োজনের পরও সংকট কাটেনি।

সংকট:

অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি

আমাদের দেশীয় বিভিন্ন শিল্পের কোনোটিই আসলে ভালো অবস্থায় নেই। কোনটি হয়তো একেবারেই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, কোনটি আবার নিভু নিভু অবস্থায় আছে। এ অবস্থায় পাটশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অভ্যন্তরীণভাবে চাহিদা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। যদিও বিগত এক দশকে বাংলাদেশ সরকার পাটশিল্পের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। কখনো বেসরকারীকরণ কর্মসূচি, কখনো লোকসানি পাটকল বন্ধ করতে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অবসর প্রদান, কখনো পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে নানাবিধ নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১০ সালে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন পাস হয়। ‘আবশ্যিক পণ্য মোড়কীকরণ আইন’ নামের সেই আইনে দেশের অভ্যন্তরে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ইত্যাদি বাল্ক পণ্য বাধ্যতামূলকভাবে পাটের বস্তায় মোড়কীকরণের নিয়ম চালু হয়। এরপর ২০১৩ সালে এ বিষয়ে বিধিমালা জারি হয় এবং পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে পশুখাদ্য পর্যন্ত সব ধরনের মোড়কে পাটের বস্তা ব্যবহারের আইনি নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এ ধরনের উদ্যোগের ফলে পাটের বস্তা ব্যবহারের চাহিদা বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র কিন্তু ভিন্ন। পাটের ব্যবহার আসলে তেমন বাড়েনি। কেন বাড়েনি, সেটা নিয়ে আলাদা আলাপ হতে পারে। বরং পলিথিন আরও সর্বগ্রাসী হয়েছে। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ‘সোনালি ব্যাগ’–এর সম্ভাবনা সৃষ্টির যে কথা ছিল, তা আসলে হয়নি। এর ওপরে রয়েছে প্রতিবেশী প্রতিযোগী দেশ ভারতের উচ্চমাত্রায় অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক। সবকিছু মিলিয়ে আমরা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও তার বিপরীতে জোগানের বিষয়টি সঠিকভাবে এখনো নিরূপণ করতে পারিনি।

ভোগান্তির আরেক নাম জাগ দেওয়া

পাট জাগ দিতে পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। পাট জাগ দিতে প্রায় চার-পাঁচ হাত গভীর পানির প্রয়োজন। বৃষ্টি কম হলে খাল-বিল, নদ-নদীতে পানি কম থাকলে পাট দাগ দিতে কৃষকদের সমস্যায় পড়তে হয়। এতে করে অনেক কৃষক অপরিষ্কার পানিতে পাট জাগ দিতে বাধ্য হয়। এতে পাটের আঁশের রং কালচে হয়ে যায়। ফলে মানসম্মত আঁশ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে পরিষ্কার পানিতে পাট জাগ দিলেও পরিবেশগত কিছু ইস্যু সামনে চলে আসে। এই উভয় সংকট থেকে রেহাই পেতে স্বল্প পানিতে পাট শুকানোর রিবন রেটিং পদ্ধতি মাঠপর্যায়ে কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। তবে কৃষকের মধ্যে এটি এখনো জনপ্রিয় করানো যায়নি। তাই এই পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করানোর পাশাপাশি মাইক্রোবিয়াল এসিস্টেড রেটিংয়ের মতো জাগ দেওয়ার আধুনিক অন্যান্য পদ্ধতিগুলো নিয়েও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

তথ্যঘাটতি

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা এবং সেই বাজার ধরে রাখা, এটি একটি জটিল কাজ। আমাদের অনেক ব্যবসায়ী আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ঠিকমতো ওয়াকিবহাল নয়। কোন জায়গা থেকে শুরু করতে হবে, ইউরোপ বা আমেরিকার বাজারে পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি কেমন, নতুন পণ্য বা প্রযুক্তি কি আসছে—এ সব বিষয় নিয়ে গবেষণা বা তথ্যের কিছুটা ঘাটতি আছে। এর পাশাপাশি আমাদের প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোয় পাটের উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা এবং নতুন প্রযুক্তি ও পাটপণ্য নিয়ে তাদের কার্যক্রম—এসব বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।

অকার্যকর বিপণন কৌশল

আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতাদের বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের সক্ষমতা নিয়ে ভালো ধারণা দেওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচার-প্রচারণা, বিজ্ঞাপন প্রদান করতে হবে। এসব বিষয়ে আমরা বোধহয় কিছুটা হলেও পিছিয়ে আছি। বিপণন কৌশল মতো আকর্ষণীয় হবে, ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে পৌঁছা কিছুটা হলেও সহজ হবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা এখানেও পিছিয়ে আছি। আমাদের পাট ও পাটজাত পণ্য নিয়ে ‘জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (JDPC)’ নামে যে একটি সেন্টার আছে, এটা বাংলাদেশের কতজন মানুষ জানে? পুরো দেশের কথা বাদ দিলাম, খোদ রাজধানী ঢাকার ভেতরে কতজন মানুষ এটি সম্পর্কে অবগত? অথচ এটি বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন, ব্যবহার ও সম্প্রসারণ নিশ্চিতকরণের রূপকল্প নিয়ে সরকারিভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিপণন কৌশলের দুর্বলতার কারণে আমরা অভ্যন্তরীণ বাজারেও পাটজাত পণ্যের অবস্থান সবার কাছে তুলে ধরতে পারিনি।

ভালো বীজের অভাব ও অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতা

ভালো বীজে ভালো ফসল—ফসল উৎপাদনে এটি অন্যতম পূর্বশর্ত। পাটের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ভালো বীজের অভাব। ভালো মানের পাট উৎপাদন করতে হলে গুণগত মানসম্পন্ন দেশীয় বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ করতে হবে। সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বীজ বিতরণের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। প্রতিষ্ঠানটি তাদের নির্ধারিত চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের (কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার) মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করে থাকে। এ ক্ষেত্রেও মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন সমস্যা আছে। ফলশ্রুতিতে পাটের মানসম্মত বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। পাটের বীজের এই ঘাটতি পূরণ করতে কৃষককে নির্ভর করতে হয় আমদানি করা বীজের ওপর। আমরা পাটবীজ উৎপাদনে এখনো স্বনির্ভর নই। কৃষকদের নির্ভর করতে হয় ভারত থেকে আমদানি করা পাটবীজের ওপর। আমদানি চ্যানেল এবং ভিন্ন মাধ্যমেও পাটের বীজ আমাদের দেশে প্রবেশ করে। এগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশ পাটবীজের জন্য ভারতের ওপর কতটুকু নির্ভরশীল, তা পরিসংখ্যানের দিকে একটু নজর দিলেই বোঝা যাবে। ২০২৩-২৪ সালে মোট পাটবীজের চাহিদা ছিল প্রায় ৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেট্রিক টন পাটবীজ ভারত থেকে আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করে কৃষি মন্ত্রণালয়। এটি মোট চাহিদার প্রায় ৮৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২২-২৩ সালে ৫ হাজার মেট্রিক টন পাটবীজের আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়।এর বিপরীতে প্রকৃত আমদানি হয়েছিল ৪ হাজার ১৬৬ মেট্রিক টন। দেশি বীজে চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১৫ ভাগ পূর্ণ হলেও মোট চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ বীজ আমদানি নির্ভর। এসব বীজের আমদানি খরচ প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। আমদানি করা ভারতের এই পাটবীজের ওপর নির্ভর করে আমাদের দেশের পাটকলগুলো কাঁচা পাট পাবে কি না। আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারত আমাদের প্রতিযোগী। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় প্রজাতির পাটের প্রতি নজর দিতে হবে। আমাদের দেশেই প্রায় ৫০ প্রজাতির পাট রয়েছে। পাটবীজের জন্য ভারতের ওপর আমদানিনির্ভরতা কমাতে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংসহ বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। দেশীয়ভাবে যদি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পাটবীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা করা যায়, তাহলে ভারতের ওপর এই অতিনির্ভরতা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব এবং বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হবে।

রোগবালাইয়ের আক্রমণ

পাটচাষিদের আধুনিক চাষব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা না থাকা, অনেক ক্ষেত্রে ধারণা থাকলেও আগ্রহ না থাকা ইত্যাদি কারণে পাটের আশানুরূপ উৎপাদন হয় না। কৃষকরা বেশির ভাগ সময়েই পাটবীজ শোধন করে বপন করে না। এর ফলে চারা ঠিকমতো গজায় না এবং উৎপাদন কম হয়। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ। দেশে প্রতিবছর কমবেশি প্রায় ২০ শতাংশ পাট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাহত হয়। এ ক্ষেত্রে মানসম্মত উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পাটের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং পাটচাষিদের আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

পাটশিল্পের উন্নয়নে ভবিষ্যৎ করণীয়

গবেষণায় বিনিয়োগ

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (BJRI) আমাদের দেশে পাট নিয়ে গবেষণা করার একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। এটি পাটের উচ্চফলনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনসহ পাটজাত পণ্য ও প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। সেই ২০১০ সালে আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করে এক অনন্য মাইলফলক অর্জন করেছিলেন। এর ফলে ভবিষ্যতে পাটের নতুন জাত ও এর বহুমুখী ব্যবহার উদ্ভাবনে নতুন দিগন্ত সূচিত হয়েছে। এখন এই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সার্বিক সফলতা পেতে আমাদের গবেষণা খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে, যাতে আমরা পাটের নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন তৈরি করতে পারি। সেই সঙ্গে পাটজাত পণ্যের মান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে আমাদের আধুনিক মেশিনারিজ ও প্রসেসিং টেকনোলজি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

ডিজিটাল মার্কেটিং

পাটজাত পণ্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দেশের ভিতরে এবং বহির্বিশ্বের কাছে পাট ও পাটজাত পণ্যের প্রচারের জন্য অনলাইন মার্কেটপ্লেসে পাটজাত পণ্যের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সমাদৃত অনলাইন মার্কেটপ্লেস অ্যামাজন, আলিবাবা ইত্যাদির মতো ই-কমার্স সাইটগুলোয় কীভাবে আমাদের এই পণ্যকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা থাকতে হবে।

কৃষকদের জন্য সাপ্লাই চেইন মজবুত করা

পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত পাটবাজারে যাতে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করা যায়, সেদিকে সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। পাটচাষিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাটবীজ উৎপাদনকারী কৃষকদের প্রণোদনা কিংবা তাদের জন্য বিশেষ কোন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। পাট চাষাবাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আধুনিক কৃষি সরঞ্জামের সরবরাহ কৃষকের হাতের নাগালে রাখতে হবে। পাট থেকে গুণগত মানসম্পন্ন আঁশ পেতে উন্নতমানের পাটবীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ ও প্রচার প্রচারণা

বহির্বিশ্বে পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদেশে আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোয় বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। কূটনৈতিক প্রচারণা চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ একান্ত জরুরি। বাংলাদেশের পাটের বিপণন বাড়াতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করে ‘Made in Bangladesh’ পাটজাত দ্রব্যের প্রচারণা চালাতে হবে। ইউরোপ, চীন, তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্যসহ সম্ভাবনাময় বাজারগুলো খুঁজে বের করে আমাদের পাটের বিপণন বাড়াতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সচেতনার এই সময়ে পাটের জায়গা নিতে পারে, এ রকম বিকল্প বিশ্বে খুব কমই আছে। আজ বিশ্বের ১৩৫টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে থাকে। আমাদের সোনালি আঁশের ঐতিহ্য, এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বৈশ্বিক বাজার চাহিদা এবং সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব গুণের কারণে আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে পাটকে বিশ্ব দরবারে আবারও বাংলাদেশের ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরার। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগ, আধুনিক বিপণন কৌশল, সংযোজিত উচ্চমূল্য পাটপণ্য উদ্ভাবন, স্থিতিশীল গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা পাটকে নিয়ে যেতে পারব একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে—এটাই সবার প্রত্যাশা।

মো. হাসান ইমাম, কৃষিবিদ, সরকারি চাকরিজীবী

Read full story at source