বাঁহাতিরা কি সত্যিই ডানহাতিদের চেয়ে বেশি সৃজনশীল
· Prothom Alo

ইতিহাসের অনেক সফল ও বিখ্যাত ব্যক্তিই ছিলেন বাঁহাতি। সম্রাট আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, জুলিয়াস সিজার থেকে শুরু করে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি কিংবা মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর মতো মহান শিল্পীরাও এই তালিকায় আছেন। বিনোদন আর খেলার জগতে চার্লি চ্যাপলিন, অমিতাভ বচ্চন, টম ক্রুজ, ম্যারাডোনা কিংবা আমাদের সাকিব আল হাসানের মতো তারকারা বাঁহাতি। এমনকি আলবার্ট আইনস্টাইন, বিল গেটস ও গিটারিস্ট জিমি হেন্ডরিক্সও বাঁ হাত ব্যবহার করতেন।
Visit sweetbonanza.qpon for more information.
হয়তো যুগের পর যুগ ধরে এসব সফল মানুষদের দেখেই আমাদের মনে ধারণা জন্মেছে বাঁহাতিরা বুঝি ডানহাতিদের চেয়ে বেশি সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু কেবল বাঁ হাতের ব্যবহার কি আসলেই কাউকে অন্যদের চেয়ে বেশি মেধাবী করে তোলে? বিজ্ঞানীরা কি সত্যিই এমন কোনো প্রমাণ পেয়েছেন, নাকি এটি কেবলই একটি প্রচলিত ধারণা?
বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ মানুষ বাঁহাতি। গত এক শতাব্দী ধরে মানুষ বিশ্বাস করে যে বাঁহাতিরা জন্মগতভাবেই বেশি সৃজনশীল। বিশ্বখ্যাত বাঁহাতি ব্যক্তিদের সাফল্য এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। অনেকের মতে, বাঁহাতিদের মধ্যে অন্যদের চেয়ে আলাদা কোনো শৈল্পিক বা উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকে।
যুদ্ধ হলে তেল-গ্যাসের দাম বাড়ে কেনবিজ্ঞানীরা প্রায় এক হাজার গবেষণা যাচাই করলেও মাত্র ১৭টিতে সঠিক ও মানসম্মত তথ্য পেয়েছেন। এসব গবেষণায় সৃজনশীলতা মাপার প্রায় ৫০টি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল।
বিজ্ঞানীরাও এই সম্ভাবনা নিয়ে ভেবেছেন। মানুষের বাঁ হাত মূলত মস্তিষ্কের ডান অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যেহেতু মস্তিষ্কের ডান দিক সৃজনশীলতা বা ভিন্নধর্মী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত, তাই ধারণা করা হতো বাঁহাতিরা বেশি উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। তারা খুব সহজেই নতুন ও ভিন্ন সব ধারণা তৈরি করতে পারেন।
তবে সম্প্রতি নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিষয়টি আসলে অতটা সহজ নয়। বিজ্ঞানীদের সংগৃহীত তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাঁহাতি হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে বাড়তি সৃজনশীলতার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। অর্থাৎ এই জনপ্রিয় ধারণাটির আসলে তেমন কোনো মজবুত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
লেওনার্দো দা ভিঞ্চিকর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল ক্যাসাসান্টো ও তাঁর দল এই বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। তাঁরা ১৯০০ সাল থেকে প্রকাশিত প্রায় এক হাজারটি পরীক্ষা যাচাই করে দেখেছেন। তবে এর মধ্যে অনেকগুলোই তাঁরা বাদ দিয়েছেন। কারণ, সেগুলোতে হাতের ব্যবহারের সঠিক তথ্য ছিল না অথবা শুধু ডানহাতিদের নিয়েই পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীলতায় বাঁহাতিদের আলাদা কোনো বাড়তি সুবিধা নেই। বরং কিছু পরীক্ষায় ডানহাতিরাই বেশি সৃজনশীল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি যেসব পেশায় অনেক বেশি বুদ্ধিবৃত্তি ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন, সেখানেও ডানহাতিদের সংখ্যাই বেশি দেখা যায়। গবেষণাটি ‘সাইকোনমিক বুলেটিন অ্যান্ড রিভিউ’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণী কেন কাঁদে না, মানুষের কান্নার পেছনের বিজ্ঞানঅধ্যাপক ক্যাসাসান্টো এই ভুল ধারণার পেছনে তিনটি কারণ দেখিয়েছেন। প্রথমত, বাঁহাতি হওয়া ও সৃজনশীল হওয়া দুটোই বিরল ঘটনা। তাই মানুষ এই দুটি বিষয়কে মিলিয়ে ফেলে।
বিজ্ঞানীরা প্রায় এক হাজার গবেষণা যাচাই করলেও মাত্র ১৭টিতে সঠিক ও মানসম্মত তথ্য পেয়েছেন। এসব গবেষণায় সৃজনশীলতা মাপার প্রায় ৫০টি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। একটি সাধারণ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল কোনো বস্তুর ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহারের তালিকা করতে। দেখা গেছে, ডানহাতি বা বাঁহাতি হওয়ার কারণে এই পরীক্ষায় ফলে কোনো পার্থক্য হয়নি। তবে যেখানে সামান্য পার্থক্য পাওয়া গেছে, সেখানে ডানহাতিরাই কিছুটা এগিয়ে ছিল। এই ফল থেকে বোঝা যায়, বাঁ হাত ব্যবহার করলেই যে মস্তিষ্কের ডান দিক বেশি সক্রিয় হয়ে সৃজনশীলতা বাড়িয়ে দেবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
ল্যাবরেটরির পরীক্ষার বাইরে বাস্তব জীবনেও গবেষকরা এই বিষয়টি পরীক্ষা করেছেন। তাঁরা সংগীতশিল্পী ও চিত্রশিল্পীদের মধ্যে বাঁহাতিদের সংখ্যা বেশি দেখলেও স্থপতিদের মধ্যে তেমন কিছু পাননি। পুরো বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে তাঁরা প্রায় ৭০০টি পেশার ১২ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, গণিতবিদ ও শিল্পীদের সৃজনশীলতা এখানে যাচাই করা হয়। দেখা গেছে, সৃজনশীল ক্ষেত্রগুলোতেও বাঁহাতিদের সংখ্যা আসলে কম ছিল।
২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২২ কোটির বেশি শিশু স্থূলতায় ভুগবে, বাংলাদেশে কতএই গবেষণার মানে এই নয় যে বিখ্যাত শিল্পীরা বাঁহাতি ছিলেন না। এর আসল মানে হলো, কোন হাত দিয়ে কাজ করা হচ্ছে তা দেখে কারও সৃজনশীলতা বিচার করা যায় না।অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৪৪টি টেস্ট খেলেছেন বাঁহাতি পেসার অ্যালান ডেভিডসন
অধ্যাপক ক্যাসাসান্টো এই ভুল ধারণার পেছনে তিনটি কারণ দেখিয়েছেন। প্রথমত, বাঁহাতি হওয়া ও সৃজনশীল হওয়া দুটোই বিরল ঘটনা। তাই মানুষ এই দুটি বিষয়কে মিলিয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় শিল্পীদের মধ্যে বিষণ্ণতা বা মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা যায়। কিছু গবেষণায় বাঁহাতিদের মধ্যেও এমন বৈশিষ্ট্য পাওয়ায় মানুষ সবগুলোকে একটি প্যাকেজ হিসেবে ধরে নেয়। তৃতীয়ত, মানুষ প্রায়ই ছোট ছোট কিছু গবেষণার উদাহরণ দেয়, যেখানে শুধু শিল্পী বা সংগীতশিল্পীদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বড় ও নির্ভরযোগ্য গবেষণাগুলো মানুষ এড়িয়ে যায়।
এই গবেষণার মানে এই নয় যে বিখ্যাত শিল্পীরা বাঁহাতি ছিলেন না। এর আসল মানে হলো, কোন হাত দিয়ে কাজ করা হচ্ছে তা দেখে কারও সৃজনশীলতা বিচার করা যায় না। মানুষের সৃজনশীলতা মূলত তার বুদ্ধিবৃত্তি, ব্যক্তিত্ব, কঠোর প্রশিক্ষণ ও সুযোগের ওপর নির্ভর করে। উদ্ভাবনী চিন্তা কেবল কোন হাতে কলম ধরা হচ্ছে, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছুর ওপর নির্ভর করে।
সূত্র: আর্থ ডটকম, দ্য গার্ডিয়ান, নিউরোসায়েন্স নিউজ
যে ৭ খাবার ফ্রিজে সংরক্ষণ করা একদমই উচিত নয়