মহাবিশ্ব কত বেগে প্রসারিত হচ্ছে
· Prothom Alo

১৯৯৮ সাল। বিজ্ঞানীরা এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন। তাঁরা দেখলেন, আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, এর প্রসারণের বেগও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বাড়ছে! এই রহস্যময় গতির পেছনের কারিগরের নাম দেওয়া হলো ডার্ক এনার্জি বা গুপ্ত শক্তি।
কিন্তু আড়াই দশক পার হয়ে যাওয়ার পরও পদার্থবিজ্ঞানে একটি বিশাল রহস্য অমীমাংসিত থেকে গেছে। মহাবিশ্ব ঠিক কত বেগে প্রসারিত হচ্ছে, তার নিখুঁত হিসাব মেলাতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। এই সমস্যার একটি নামও আছে, হাবল টেনশন। তবে আশার কথা হলো, বিজ্ঞানীরা এবার মহাকাশ ও সময়ের বুকে তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র ঢেউ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে এই রহস্য সমাধানের একটি দারুণ পথ খুঁজে পেয়েছেন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
কীভাবে? চলুন, একটু সহজ করে পুরো ব্যাপারটা বোঝা যাক। মহাবিশ্বের প্রসারণের হার মাপার জন্য একটি ধ্রুবক ব্যবহার করা হয়। এর নাম হাবল কনস্ট্যান্ট বা হাবল ধ্রুবক। মুশকিল হলো, এই ধ্রুবকের মান বের করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন উত্তর পাচ্ছেন!
শিল্পীর কল্পনায় টাইপ ১এ সুপারনোভার ছবিআপনি যদি আমাদের কাছাকাছি থাকা বা বর্তমান মহাবিশ্বের হিসাব কষেন, তবে হাবল ধ্রুবকের একটা নির্দিষ্ট মান পাবেন। এ ক্ষেত্রে টাইপ ১এ সুপারনোভা নামে বিশেষ ধরনের মৃত নক্ষত্রের বিস্ফোরণ মেপে হিসাব করা হয়। কিন্তু আপনি যদি অনেক দূরের বা একদম আদিম মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে হিসাব কষেন, তবে উত্তর আসবে একদম আলাদা!
হাবল ধ্রুবক নিয়ে বিড়ম্বনামহাবিশ্বের প্রসারণের হার মাপার জন্য একটি ধ্রুবক ব্যবহার করা হয়। এর নাম হাবল কনস্ট্যান্ট বা হাবল ধ্রুবক। মুশকিল হলো, এই ধ্রুবকের মান বের করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন উত্তর পাচ্ছেন!
ব্যাপারটা সহজে বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দিই। আপনি একটা গাড়ির গতি মাপছেন। গাড়ির স্পিডোমিটার বলছে গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার, কিন্তু জিপিএস বলছে গতি ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার! দুটি যন্ত্রই বিশ্বের সেরা, কিন্তু উত্তর আলাদা। তাহলে কোনটি ঠিক? এই যে দুই উত্তরের মধ্যে দ্বন্দ্ব, একেই বলে হাবল টেনশন। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই এমন একটা তৃতীয় উপায় খুঁজছিলেন, যা দিয়ে এই দুই উত্তরের মধ্যে সঠিক কোনটা, তা যাচাই করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন এবং ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর একদল গবেষকের মতে, এই তৃতীয় উপায়টি হতে পারে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯১৫ সালে, আলবার্ট আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্বের হাত ধরে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, মহাবিশ্বের স্থান-কাল একটা চাদরের মতো। গ্রহ বা নক্ষত্রের মতো ভারী কোনো বস্তু রাখলে সেই চাদরটা একটু দেবে যায়। এই দেবে যাওয়াটাই হলো মহাকর্ষ বল!
মহাবিশ্বের স্থান-কাল একটা চাদরের মতোকিন্তু যখন দুটি ব্ল্যাকহোলের মতো খুব ভারী কোনো বস্তু স্পেসটাইমের চাদরে প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকে বা ধাক্কা খায়, তখন পুকুরে ঢিল ছোড়ার মতো মহাশূন্যেও ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। আলোর বেগে ছুটে চলা এই ঢেউগুলোকেই বলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লাইগো মানমন্দির প্রথমবারের মতো এই তরঙ্গ শনাক্ত করে ইতিহাস গড়েছিল। ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের দুটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ থেকে সেই ঢেউ পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিল! এরপর থেকে লাইগো এবং এর সঙ্গী ডিটেক্টর ভার্গো ও কাগরা মিলে ব্ল্যাকহোল ও নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষের বহু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেছে।
ব্ল্যাকহোল হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে নিউট্রন স্টার কতটা ছোট হতে পারেআইনস্টাইন বলেছিলেন, মহাবিশ্বের স্থান-কাল একটা চাদরের মতো। গ্রহ বা নক্ষত্রের মতো ভারী কোনো বস্তু রাখলে সেই চাদরটা একটু দেবে যায়। এই দেবে যাওয়াটাই হলো মহাকর্ষ বল!
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ দিয়ে হাবল ধ্রুবক মাপার আইডিয়াটা পুরোনো হলেও আগে এতে যথেষ্ট সূক্ষ্মতা ছিল না। কিন্তু ইলিনয় সেন্টারের গবেষক নিকোলাস ইউনেস এবং শিকাগো ইউনিভার্সিটির ড্যানিয়েল হোলজ এবার নিয়ে এসেছেন এক যুগান্তকারী পদ্ধতি। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন স্টোকাস্টিক সাইরেন মেথড।
এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা শুধু কাছের কোনো নির্দিষ্ট ব্ল্যাকহোলের প্রচণ্ড সংঘর্ষের দিকে কান পাতবেন না, বরং তাঁরা মহাবিশ্বের পেছনের গুনগুন শব্দ শোনার চেষ্টা করবেন! ব্যাপারটা একটা বড় পার্টি বা বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো ভাবুন। আপনার আশপাশে যারা জোরে কথা বলছে, আপনি তাদের কথা স্পষ্ট শুনতে পান। কিন্তু এর বাইরেও পুরো হলরুম জুড়ে অনেক দূরের মানুষের কথার একটা সম্মিলিত গুনগুন শব্দ থাকে। মহাবিশ্বেও অনেক দূরের অসংখ্য ব্ল্যাকহোল সংঘর্ষের এমন একটা সম্মিলিত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আছে।
গবেষক দলের সদস্য কাজিনস একটি দারুণ যুক্তি দেখিয়েছেন। হাবল ধ্রুবকের মান যদি কম হয়, তবে মহাবিশ্বের আয়তন তুলনামূলক ছোট হবে। ছোট জায়গায় ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ঘনত্ব বেড়ে যাবে, ফলে ওই গুনগুন শব্দটা অনেক জোরালো হবে।
হাবল ধ্রুবক নিয়ে বিড়ম্বনাস্টোকাস্টিক সাইরেন মেথড পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা শুধু কাছের কোনো নির্দিষ্ট ব্ল্যাকহোলের প্রচণ্ড সংঘর্ষের দিকে কান পাতবেন না, বরং তাঁরা মহাবিশ্বের পেছনের গুনগুন শব্দ শোনার চেষ্টা করবেন!
উল্টোদিকে, যদি হাবল ধ্রুবকের মান বেশি হয়, তবে আয়তন বড় হওয়ায় সংঘর্ষগুলো অনেক দূরে দূরে ঘটবে। ফলে ব্যাকগ্রাউন্ডের ওই গুনগুন শব্দটাও হবে বেশ দুর্বল। বিজ্ঞানীরা লাইগো-ভার্গো-কাগরা ডিটেক্টরের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, আমরা এখনো ওই ব্যাকগ্রাউন্ড সিগন্যাল বা গুনগুন শব্দটা জোরালোভাবে ধরতে পারছি না। মানে মহাবিশ্বের আয়তন বড়, আর হাবল ধ্রুবকের মানও বেশি! অর্থাৎ, মহাবিশ্ব অনেক দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কাল্পনিক ছবিএই গবেষণাটি সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস-এ প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি আপাতত একটি প্রুফ অব কনসেপ্ট বা ধারণার প্রমাণ। আগামী ছয় বছরের মধ্যে আমাদের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ডিটেক্টরগুলো আরও অনেক বেশি আধুনিক ও সংবেদনশীল হয়ে উঠবে। তখন তারা মহাবিশ্বের ওই আদিম গুনগুন শব্দ খুব সহজেই শুনতে পাবে। আর তখনই আমরা পেয়ে যাব হাবল ধ্রুবকের একদম নিখুঁত একটা মান। হয়তো সেদিনই চিরতরে দূর হবে পদার্থবিজ্ঞানের সেই বিখ্যাত হাবল টেনশন!
লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুরসূত্র: স্পেস ডটকমআলোর গতিতে ছুটলেও কি মহাবিশ্বের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব