সুলতান’স সোফরা’: র্যাডিসন ব্লু ঢাকার ইফতার ও সাহ্রিতে অটোমান ঐতিহ্যের স্বাদ
· Prothom Alo

র্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে ‘সুলতান’স সোফরা’ আয়োজন ইফতার-সাহ্রিতে এনেছে অটোমান ঐতিহ্যের রাজকীয় স্বাদ। তুর্কি কাবাব, মেজে ও মিষ্টির বৈচিত্র্যে মিলছে বিলাসবহুল রন্ধনভ্রমণের অনন্য অভিজ্ঞতা।
তুরস্কের খাবারের প্রতি সারা বিশ্বের ভোজনরসিকদের অন্য রকম আকর্ষণ কাজ করে। প্রায় ৬০০ বছরের অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ও ঐশ্বর্যের প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে পড়েছে তাদের খাদ্যসংস্কৃতিতে। মধ্য এশিয়ার যাযাবর তুর্কিদের সরল ও টাটকা খাবার মাংস, দই ও গমভিত্তিক পদ শতাব্দী পেরিয়েও আজকের তুর্কি রান্নার ভিত্তি হয়ে আছে। আনাতোলিয়ায় আসার পর সেলজুক সাম্রাজ্য নতুন উপাদান ও রান্নার কৌশল যুক্ত করে খাবারে বৈচিত্র্য আনে।
Visit milkshakeslot.com for more information.
তুর্কি পদের বৈচিত্র্যময় সমাহারাপরে সুলতানদের আমলে অটোমান সাম্রাজ্য তুর্কি রান্নাকে প্রাসাদীয় আভিজাত্য ও সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে দেয়। কাবাব, দুধের তৈরি পদ, মিষ্টি ও শরবতের বিস্তার ঘটে এবং এই প্রভাব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২৩ সালে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তুর্কি রান্না দুই ধারায় বিকশিত হয়—আঞ্চলিক লোকজ রন্ধনশৈলী এবং টপকাপি প্রাসাদভিত্তিক ধ্রুপদি রান্না। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে আজকের তুর্কি রন্ধনশৈলী বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
এই রমজানে ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেলগুলো আয়োজন করেছে বিলাসবহুল ইফতার ও সাহ্রির। এর মধ্যে র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেল, ঢাকা আয়োজন করেছে ‘সুলতান’স সোফরা’ অর্থাৎ সুলতানের ভোজের টেবিল বা রাজকীয় দাওয়াতের আসর।
তুর্কি সেভরি ও কাবাব এক্সপার্ট শেফ চেলিক আহমেত মেলিকগাজিপুরো রমজানে চলা এই আয়োজনে অটোমান আমেজে আন্তর্জাতিক রন্ধন অভিজ্ঞতা উপভোগের সুযোগ পাচ্ছেন ঢাকার ভোজনরসিকেরা। কয়েক মাস আগে ইস্তাম্বুল ঘুরে আসার পর থেকেই তুর্কি খাবারের প্রতি আলাদা টান তৈরি হয়েছে। তাই কাজের সূত্রে র্যাডিসন ব্লুতে গেলেও আগ্রহ ছিল তুরস্ক থেকে আসা ঐতিহ্যবাহী তুর্কি ডেজার্ট বিশেষজ্ঞ শেফ ওনহান হাসান গাজিয়ানতেপ এবং তুর্কি সেভরি ও কাবাব বিশেষজ্ঞ শেফ চেলিক আহমেত মেলিকগাজির তৈরি আসল তুর্কি পদ চেখে দেখার।
র্যাডিসন ব্লুর বলরুমে ঢুকেই মনে হলো, যেন শুধু খাবার নয়, সাজানো হয়েছে পুরো সুলতানি ভোজের আবহে। মূল মঞ্চে চোখে পড়ল উটের আবক্ষ মূর্তি, পাশাপাশি সুলতানদের সিংহাসনের আদলে তৈরি রাজকীয় আসন। সাজসজ্জায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব থাকলেও বিভিন্ন জায়গায় সেলজুক ও অটোমান মোজাইকের মতো করে করা ডিজিটাল চিত্রকর্ম দৃষ্টি কাড়ে। আবহসংগীতে তুর্কি যন্ত্রসংগীত নিয়ে গেল টোপকাপি প্যালেসের রাজকীয় ভোজনালয়ে।
এই আয়োজন দৃষ্টিনন্দনওবলরুমের বাইরে সাজানো ছিল ল্যাম্ব ওজি, ফালাফেল, হালিম, গরুর মাংস ও ছোলার ঝোল, আমাদের পরিচিত ভাজা, দেশীয় ফল এবং জিলাপিসহ নানা মুখরোচক পদ। ভেতরে সারি সারি সুসজ্জিত টেবিল, আর মাঝখানের দীর্ঘ করিডরজুড়ে বিভিন্ন ধরনের সালাদ, সামুদ্রিক পদ, বিরিয়ানি, শরবত ও তুর্কি মিষ্টান্নসহ অসংখ্য খাবারের আয়োজন। এর মাঝে শেফদের কাছ থেকে জানলাম বেশ কিছু রন্ধনকৌশল।
ফালাফেল (নোহুত কোফতেসি)
ছোলা বা নোহুত দিয়ে তৈরি মিহি বড়াকে তুর্কিতে বলা হয় ‘Köftesi’, অর্থাৎ কোফতা বা ছোট ছোট বল। প্রথমে ছোলা রাতভর ভিজিয়ে রাখা হয়, এরপর মিহি করে বেটে পেঁয়াজ, রসুন, ধনে ও জিরা মিশিয়ে গোল গোল ছোট বড়া বানানো হয়। এগুলো ঘি বা তেলের মধ্যে সোনালি রং হওয়া পর্যন্ত ভাজা হয়। খাওয়ার সময় খোসা ফেটে ভেতরের নরম ও সুগন্ধি ছোলা মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে জনপ্রিয় এই পদ তুর্কিতেও ইফতারে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে এখানকার ফালাফেলের বিশেষত্ব হলো তিলের ব্যবহার, যার মচমচে স্বাদ ভিন্ন স্বাদ দেয়।
বিফ অ্যান্ড চিকপিস স্টু (নোহুত ইয়েমেগি)
এই স্টুতে ব্যবহার করা হয় নরম গরুর মাংস এবং নোহুত (ছোলা)। এটি মূলত ইতালিয়ান রান্নার ধরন অনুযায়ী মাংস, আলু ও ছোলাকে মসলা, সবজি এবং টমেটো সস দিয়ে ধীরে ধীরে সেদ্ধ করা হয়, যাতে স্বাদ পুরো ঝোলে মিশে যায়। ইতালি ও গ্রিসে একসময় অটোমানদের শাসন ছিল; সেখান থেকেই এই খাবার অনুপ্রাণিত। যদিও টমেটোর অতিরিক্ত ব্যবহার সব স্বাদের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে না–ও যেতে পারে, তুর্কি রন্ধনে টমেটোর ব্যবহার দেখা যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার এর স্বাদ মন্দ লাগেনি।
ফিশ সায়াডি
তুর্কি রন্ধনশৈলীর একটি বিশেষ পদ, যা মূলত মাছ দিয়ে রান্না করা হয়। তুরস্কের সামুদ্রিক খাবারের নিজস্ব একটা ধরন আছে যাতে মেডিটোরিয়ান ও পারস্য মসলার মিশেল আছে তেমনি এক মাছের পদ ফিস সায়াডি।
‘সায়াডি’ বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট এক রন্ধনপ্রণালি, যেখানে মাছকে ধীরে ধীরে মসলা, টমেটো, পেঁয়াজ, লেবু ও সুগন্ধি উপাদানের সঙ্গে সেদ্ধ বা বেক করা হয়। ফলে মাছ থাকে নরম, রসালো ও সুস্বাদু। এখানে এই পদ পরিবেশন করা হয়েছে বাসমতী চালের বিরিয়ানির সঙ্গে, উপমহাদেশীয় ফিউশনের স্বাদ এনে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। আমার কাছে এই মাছের বিরিয়ানি বেশ লেগেছে।
টার্কিশ ল্যাম্ব শ্যাঙ্ক
টার্কিশ ল্যাম্ব শ্যাঙ্ক ধীরে রান্না করা খাসির পায়ের মাংসের একটি সুস্বাদু পদ। তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চল ভালো মানের ভেড়ার মাংসের জন্য প্রসিদ্ধ। সে কারণেই তুর্কিদের যেকোনো উৎসবে পছন্দের পদ হিসেবে থাকে টার্কিশ ল্যাম্ব। প্রথমে ল্যাম্ব শ্যাঙ্ককে হালকা মসলা দিয়ে মেরিনেট করা হয়, এরপর টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন ও সুগন্ধি মসলা দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সেদ্ধ বা ব্রেইজ করা হয়। ঢিমে আঁচে রান্নার ফলে মাংস এতটাই নরম হয়ে যায় যে হাড় থেকে সহজেই আলাদা হয়ে আসে। রসাল ঝোল আর মাংসের গভীর স্বাদ এই পদকে করে তোলে রাজকীয়। আমার খাওয়া এটাই সেরা ল্যাম্ব শ্যাঙ্ক।
সামাক হারা (পিলাকি)
‘সামাক হারা’ নামটি মূলত আরবি শব্দ থেকে এসেছে। সামাক অর্থ মাছ আর হারা অর্থ ঝাল বা মসলাদার। এটি মধ্যপ্রাচ্যের একটি জনপ্রিয় মাছের পদ। তুর্কি রান্নায় একই ধরনের পদ সাধারণত ‘পিলাকি’ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়, যেখানে টমেটো, অলিভ অয়েল, রসুন ও পেঁয়াজ দিয়ে মাছকে ধীরে রান্না করা হয়; অর্থাৎ সামাক হারা সরাসরি তুর্কি ঐতিহ্যবাহী নাম নয়, তবে তুর্কি রান্নায় এর কাছাকাছি স্বাদের পদ আছে বলে জানালেন শেফ চেলিক আহমেত মেলিকগাজি। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল প্রভাবিত মাছের রেসিপি বলে এর স্বাদ আমাদের উপমহাদেশীয় স্বাদের থেকে একেবারেই আলাদা।
ল্যাম্ব স্টাফড ক্যাপসিকাম
তুর্কি রন্ধনশৈলীর জনপ্রিয় একটি পদ, যা তুর্কিতে বিবার দোলমা নামে পরিচিত। ‘দোলমা’ অর্থ ভরা বা স্টাফ করা। এই পদে ক্যাপসিকামের ভেতর ভরা হয় কিমা করা খাসির মাংস, চাল, পেঁয়াজ, টমেটো ও সুগন্ধি মসলা। কখনো এতে যোগ করা হয় পার্সলে বা অলিভ অয়েল, যা স্বাদকে আরও সমৃদ্ধ করে। এরপর ধীরে ধীরে বেক বা সেদ্ধ করা হয়, যাতে ক্যাপসিকাম নরম হয়ে ভেতরের পুরের সঙ্গে মিশে যায়। রসাল মাংস, হালকা মসলা আর সবজির প্রাকৃতিক মিষ্টতায় এই পদ হয়ে ওঠে সুষম ও তৃপ্তিদায়ক। আমার কাছে মোটামুটি লেগেছে।
টার্কিশ বেবি পটেটো সালাদ
এই সালাদ তুর্কি রন্ধনশৈলীর একটি জনপ্রিয় মেজে পদ। তুর্কি খাবার সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মেজে। ছোট আকারের আলু সেদ্ধ করে এতে মেশানো হয় অলিভ অয়েল, লেবুর রস, রসুন, পেঁয়াজকুচি ও তাজা পার্সলে। কখনো যোগ করা হয় সুমাক বা লালমরিচের গুঁড়া, যা স্বাদে হালকা টক ও মসলার মাত্রা আনে। এই সালাদের বিশেষত্ব হলো ভারী মেয়োনিজ নয়, বরং অলিভ অয়েল ও লেবুর সতেজ স্বাদ। ইফতারি বা মূল খাবারের আগে হালকা ও সুষম পদ হিসেবে এটি বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া মেজে কর্নারে চোখে পড়ল হায়দারি (ঘন দই, রসুন, ডিল পাতা ও অলিভ অয়েল দিয়ে তৈরি ক্রিমি ডিপ), পাতলিজান সালাতাসি (পোড়া বেগুন, লেবুর রস, রসুন ও অলিভ অয়েল দিয়ে তৈরি ধোঁয়াটে স্বাদের সালাদ), কাজিক (দই, শসা, পুদিনা ও রসুনের ঠান্ডা ডিপ) ও সিগারা বোরেক (চিজ বা কিমা দিয়ে রোল করা ও ভাজা পেস্ট্রি)।
তুর্কি মিষ্টি
ডেজার্ট বিশেষজ্ঞ শেফ ওনহান হাসান গাজিয়ানতেপ ও তাঁর তৈরি মিষ্টিতুর্কি মিষ্টি বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। নানা ধরনের বাদাম, পেস্তা ও সিরার ব্যবহারের জন্যই এর স্বাদ সমৃদ্ধ। এর সঙ্গে অটোমান ঐতিহ্য। বেশির ভাগ মিষ্টিতে থাকে পেস্তা, আখরোট, মধু বা চিনির সিরা এবং সূক্ষ্ম স্তরযুক্ত পেস্ট্রি। বাকলাভা: ফিলো পেস্ট্রির বহু স্তরের ভেতর পেস্তা ও আখরোট, ওপরে মিষ্টির সিরা। তুর্কি ডেজার্ট শেফ ওনহান হাসান গাজিয়ানতেপ বেশ যত্ন নিয়ে সাজিয়েছেন এ কর্নারটি। সেখানে দেখা মিলল কুনাফা (কুনেফে), সুতলাচ: দুধ ও চাল দিয়ে বেক করা পায়েস। আশুরে: শস্য, ফল ও বাদাম দিয়ে তৈরি পুডিং। ফিস্তিকলি বাকলাভা: পেস্তা বাদাম দিয়ে তৈরি যা গাজিয়ানতেপ অঞ্চলে বিশেষ খ্যাত। জেভিজলি বাকলাভা: আখরোটের পুরভরা, দারুণ মজাদার। বৈচিত্র্যই বাকলাভাকে শুধু একটি মিষ্টি নয়, বরং তুর্কি রন্ধনশৈলীর এক শিল্পে পরিণত করেছে। এগুলোর স্বাদ আমার কাছে দুর্দান্ত লেগেছে।
আপনি ভিন্নতর পদ অন্বেষণে আগ্রহী হলে এই রোজায় চলে যেতে পারেন র্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে। খাঁটি তুর্কি স্বাদের ‘সুলতানস সোফরা’ আপনাকে হতাশ করবে না। বরং অটোমান আবহে সাজানো এই আয়োজন আপনাকে নিয়ে যাবে তুরস্কের সমৃদ্ধ রন্ধনভ্রমণে, যেখানে স্বাদ, সুবাস ও উপস্থাপনায় মিলবে এক রাজকীয় অনুভূতি।
ছবি: হাল ফ্যাশন