গরমের আগেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে ফ্যানের দাম

· Prothom Alo

  • বর্তমানে মোট চাহিদার ৭০–৮০ শতাংশ সিলিং ফ্যান দেশেই উৎপাদিত হয়।

  • দেশে সিলিং ফ্যানের বার্ষিক চাহিদা ৫০–৬০ লাখ। বাজারের আকার প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

    Visit amunra-online.pl for more information.

  • ফ্যান উৎপাদনকারী শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো হচ্ছে যমুনা, আরএফএল, ওয়ালটন, বিআরবি, কনকা ও এনার্জিপ্যাক।

ফাল্গুন মাস চলছে। এখনো গরম পুরোপুরি শুরু হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে বাজারে বৈদ্যুতিক পাখা বা ফ্যানের দাম বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিটি ফ্যানের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি বেড়েছে। রাজধানীর কয়েকটি ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তবে গরমের তীব্রতা বাড়লে দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পিতল ও তামার মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে কোম্পানিগুলো ফ্যানের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবছর গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতে ফ্যানের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়লেও এবার বেশি হারে বেড়েছে বলে জানান তাঁরা। উৎপাদকেরা বলছেন,  ফ্যান তৈরির যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। ফ্যানে ব্যবহৃত কেব্ল বা তারের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ফ্যানের মোটরের তামা বা কপারের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের কারওয়ান বাজার সুপারমার্কেট শাখার সভাপতি রাকিব হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিটি ফ্যানে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তামার মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে কোম্পানিগুলো ফ্যানের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।’ তবে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির ছয় মাস পর দাম বাড়ানোর কথা থাকলেও তারা ১০ দিনের মাথায় দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমন মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের কোনো নজরদারি আছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন এ ব্যবসায়ী।

দাম কতটা বেড়েছে

রাজধানীর কারওয়ান বাজার সুপারমার্কেট, জাতীয় স্টেডিয়াম মার্কেট এবং বায়তুল মোকাররম মার্কেট ঘুরে কোম্পানি ভেদে প্রতিটি ফ্যানে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে।

দোকানিরা বলছেন, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে বিআরবি ফ্যানের। কারওয়ান বাজার সুপারমার্কেটের স্বাধীন ইলেকট্রিক স্টোরের স্বত্বাধিকারী রাকিব হাসান বলেন, গত বছর প্রতিষ্ঠানটির ৫৬ ইঞ্চির একটি ফ্যান ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮৫০ টাকায়। আরএফএল কোম্পানির ৩ হাজার ১০০ টাকার ফ্যান এবার বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়।

একই বাজারের মেসার্স উজ্জ্বল ইলেকট্রিক স্টোরের কামরুল হাসান জানান, যমুনা কোম্পানির ফ্যানের দাম ৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এবার ৩ হাজার ৪০০ টাকা হয়েছে। ওয়ালটনের ২ হাজার ৬০০ টাকার ফ্যান এবার বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়। গরম এলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

মৌসুমের শুরুতেই বৈদ্যুতিক পাখা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে

মূল্যবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে জামাল ইলেকট্রিক স্টোরের মালিক জামাল উদ্দিন বলেন, ফ্যানের বাজারের একটা বড় হিস্যা দখল করে আছে বিআরবি। তুলনামূলক তাদের ফ্যানের দাম বেড়েছে বেশি। আর ক্লিক ফ্যানে ১০০ টাকা এবং সুপারস্টারে ১৫০ টাকা দাম বেড়েছে বলে জানান তিনি।

বাজারে ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার ফ্যান বেশি বিক্রি হয় বলে জানান স্টেডিয়াম মার্কেটের হাসিনা ইলেকট্রিকের মালিক। ২৫ বছর ধরে ফ্যানের ব্যবসায় যুক্ত এই বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশি ফ্যান এখন বেশি বিক্রি হয়। কারণ, পাকিস্তানি ফ্যানের দাম ৬ হাজার টাকার বেশি।

মূল্যবৃদ্ধির কারণ

মূলত আমদানিনির্ভর কাঁচামালের কারণেই দাম কিছুটা বেড়েছে বলে দাবি উৎপাদনকারীদের। তবে কোম্পানি পর্যায়ে ২০০ টাকার মতো দাম বাড়লেও খুচরা বিক্রেতারা আরও বেশি দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে দাবি তাঁদের।

ফ্যানের পুরোনো ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ১৯৭৮ সালে উৎপাদন শুরু করেছিল যমুনা ইলেকট্রনিকস। বর্তমানে বাজারে তাদের প্রায় ৩০ শতাংশ হিস্যা রয়েছে বলে দাবি করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। এবারের মৌসুমে তাদের বিক্রি গতবারের তুলনায় ৩০ শতাংশ বাড়বে বলেও প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

জানতে চাইলে যমুনা ইলেকট্রনিকসের পরিচালক (বিপণন) সেলিম উল্যা সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফ্যান তৈরির সব কাঁচামাল, যেমন ক্যাপাসিটর, বিয়ারিং, ব্লেডশিট ও কপার আমদানি করতে হয়। তাই এসব পণ্যের শুল্ক পণ্যের দামে যুক্ত হয়। আবার ডলারের বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। তাই এবার ২০০ টাকার মতো দাম বেড়েছে।’ তবে খুচরায় দাম আরও কিছুটা বেশি বেড়েছে বলে জানান তিনি।

মো. রাশেদুজ্জামান, সিওও, আরএফএল ইলেকট্রিক্যাল অ্যালায়েন্সসব ধরনের অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তারের দামও বেড়েছে। তাই ফ্যানের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেড়ে গেছে। সোনার মতো বিশ্ববাজারে কপারের দাম ওঠা-নামা করায় এমনটি হয়েছে। তবে বিক্রিতে মূল্যবৃদ্ধির খুব একটা প্রভাব পড়বে না

ফ্যানের বাজারে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান আরএফএল গ্রুপ। ভিশন ও ক্লিক নামে তাদের ফ্যানের দুটি ব্র্যান্ড রয়েছে। ২০১৩ সালে উৎপাদনে এলেও এখন বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ হিস্যা তাদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, এবার বিক্রি ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।

মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে আরএফএল ইলেকট্রিক্যাল অ্যালায়েন্সের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মো. রাশেদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সব ধরনের অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তারের দামও বেড়েছে। তাই ফ্যানের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেড়ে গেছে। সোনার মতো বিশ্ববাজারে কপারের দাম ওঠা-নামা করায় এমনটি হয়েছে। তবে বিক্রিতে মূল্যবৃদ্ধির খুব একটা প্রভাব পড়বে না।

ফ্যানের বাজার কত বড়

একসময় দেশে ভারত, পাকিস্তান ও চীন থেকে বিভিন্ন ধরনের ফ্যান আমদানি করা হতো। তবে এখন গ্রাহকের মোট চাহিদার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সিলিং ফ্যান দেশেই উৎপাদিত হয়। দেশি ফ্যান উৎপাদন করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যমুনা, আরএফএল, ওয়ালটন, বিআরবি, কনকা ও এনার্জিপ্যাকের মতো ব্র্যান্ড।

দেশে ফ্যানের বাজার কত বড়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি কোম্পানির হিসাবে দেশে সিলিং ফ্যানের বার্ষিক চাহিদা ৫০ থেকে ৬০ লাখ। ফলে গড় মূল্য আড়াই হাজার টাকা ধরলে শুধু সিলিং ফ্যানের বাজার দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫০ কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা। তবে কোম্পানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই বাজার ২ হাজার কোটি টাকার কম হবে না। আর প্রতিবছর ফ্যানের ব্যবসা বাড়ছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে। এ খাতে সিলিং ফ্যান ছাড়াও রয়েছে টেবিল ফ্যান, স্ট্যান্ড ফ্যান, ওয়াল ও চার্জার ফ্যান।

সম্প্রতি কারওয়ান বাজারের সুপারমার্কেটে বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে দুই হাজার টাকার মধ্যে কোনো পছন্দসই ফ্যান পাচ্ছিলেন না সাইদুল হাসান (ছদ্মনাম)। রোজার মধ্যে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে নন–ব্র্যান্ডের একটি ফ্যান কেনেন ২ হাজার ১০০ টাকায়। দাম নিয়ে নাখোশ ছিলেন তিনি। তার পরও গণমাধ্যমে এ নিয়ে কোনো কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন এই ক্রেতা।

Read full story at source