১৯ বছরের ঐতিহ্য: বগুড়ার মসজিদে একসঙ্গে বসে হাজার মানুষের ইফতার

· Prothom Alo

ইফতারের ঘণ্টাখানেক আগে সারিবদ্ধভাবে বসে পড়েন মুসল্লিরা। মসজিদের বারান্দায় প্লেটে প্লেটে সাজানো থাকে রকমারি ইফতারি। সময় যত গড়ায়, তত বাড়ে মুসল্লিদের ভিড়। মাগরিবের সময় ঘনিয়ে এলে খাদেম ও স্বেচ্ছাসেবকেরা একে একে হাতে তুলে দেন ইফতারের প্লেট। সেই প্লেটে থাকে বিরিয়ানি বা খিচুড়ি, ছোলা, বুন্দিয়া, জিলাপি, খেজুর, মুড়ি, পেঁয়াজো নানা খাবার। একটি প্লেট ঘিরে গোল হয়ে বসেন চার থেকে পাঁচজন। কেউ কাউকে চেনেন না, তবু একসঙ্গে ইফতার করেন—সবার পরিচয় একটাই, রোজাদার মুসল্লি।

গত শুক্রবার বগুড়া শহরের বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদে দেখা গেল এমন দৃশ্য। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার মানুষ একসঙ্গে ইফতার করেন এখানে। ধনী-গরিব, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এক প্লেটে ভাগাভাগি করে ইফতার করেন—যা সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

Visit aportal.club for more information.

রিকশাচালক নুরুল ইসলাম (৭০) ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসতেই মসজিদের সামনে রিকশা রেখে এসে বসেন বারান্দায়। আজানের সঙ্গে সঙ্গে তিনি, ব্যবসায়ী কামাল আহমেদ (৫৫), অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ (৬৫), দোকান কর্মচারী আবদুল মান্নান (৩৫), দিনমজুর জানে আলম (৬৫) ও শিক্ষার্থী রাব্বী হাসান (২২) একসঙ্গে ইফতার শুরু করেন। তাঁরা একে অপরের অপরিচিত হলেও একই প্লেটে ভাগাভাগি করে ইফতার করেন।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ১৯ বছর ধরে মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় এই আয়োজন চলছে। এতে শুধু রোজাদারদের সেবা নয়, ধনী-গরিব একসঙ্গে বসে ইফতারের মাধ্যমে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের পর থেকেই স্বেচ্ছাসেবীদের ব্যস্ততা শুরু হয়। আসরের নামাজের পর প্লেটে সাজানো হয় ইফতার সামগ্রী। বড় বড় প্লেটে খেজুর, ছোলা, পেঁয়াজি, বেগুনি, মুড়ি, জিলাপি, তরমুজ, বিরিয়ানি বা খিচুড়ি এবং শরবত রাখা হয়। ইফতারের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এসব প্লেট রোজাদারদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

মসজিদ কমিটির সদস্য ও ফল ব্যবসায়ী মাহমুদ শরীফ বলেন, ২০০৮ সালে মসজিদে নামাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই রমজানে একসঙ্গে ইফতারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাসজুড়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১০০০ মানুষের মধ্যে ইফতার বিতরণ করা হয়। রোজার আগে থেকেই তহবিল গঠন ও প্রস্তুতি শুরু হয়।

১৯ বছর ধরে মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় এই আয়োজন চলছে। সম্প্রতি বগুড়া শহরের বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদে

মসজিদের খাদেম মো. রবিউল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০০০ মানুষের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা হয়। খিচুড়ির জন্য এক থেকে সোয়া মণ সুগন্ধি চাল ও এক মণ সবজি লাগে। সপ্তাহে দুদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি গরুর মাংস দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করা হয়। এসব রান্নার জন্য বাবুর্চি নিয়োজিত থাকেন। ইফতারের সঙ্গে ছোলা, বুন্দিয়া, জিলাপি, খেজুর, মুড়ি, তরমুজ ও শরবত পরিবেশন করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মুসল্লিদের অনুদানে তহবিলে এবার প্রায় চার লাখ টাকা জমা হয়েছে।

আরেক খাদেম আবদুল করিম জানান, মাসজুড়ে ইফতার আয়োজন থাকলেও অন্তত ১০ দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, অঙ্গসংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইফতার করা হয়। বাকি প্রায় ২০ দিন মসজিদ কমিটির ব্যবস্থাপনায় আয়োজন চলে। মুসাফির, শ্রমজীবী, ভিক্ষুকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।

ইফতার করতে আসা রিকশাচালক নবীর উদ্দিন বলেন, সারা দিনে গড়ে ৫০০ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। ১০০ টাকার নিচে ইফতার কেনা যায় না। নিজের টাকায় ইফতারি কিনে খাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় এখানে ইফতারে এসেছেন তিনি। এখানে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। এক প্লেটে পাঁচজন বসে ইফতার করতে অন্যরকম ভালো লাগে।

ইফতার শেষে কথা হয় সারিয়াকান্দির দুর্গম চর এলাকার বাসিন্দা লাল মিয়া শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রোজা ছিলাম। একই প্লেটে বিরিয়ানিসহ ইফতার খেয়েছি। পেট ভরেছে। রাতে শুধু সাহরি খাবো।’

শিক্ষার্থী মুনতাসির রাফি বলেন, ‘মেসে থাকি। প্রতিদিন মেসের সবাই এ মসজিদে ইফতার করতে আসি। এখানে এক প্লেটে চার-পাঁচজন ভাগাভাগি করে ইফতার করার অনুভূতি অন্যরকম। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ নেই। এটা শুধু এক সঙ্গে ইফতার নয়; পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।’

মসজিদ কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, মসজিদটি নির্মাণ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ তিনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দীর্ঘ সময় পর গত ৩০ জানুয়ারি তিনি এখানে জুমার নামাজ আদায় করেন।

Read full story at source